ভিয়েতনামে বর্তমান সময়ে উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার ঘটনা বাড়ছে। ৬৮ বছর বয়সী থান নামের একজন ভিয়েতনামি নারী তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, উন্নয়নের নামে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া কতটা বেদনাদায়ক। তিনি পশ্চিম হানোইয়ের ওয়েস্ট লেকের কাছে তার ২৩০ বর্গমিটারের বাড়িটি হারিয়েছেন, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ভিয়েতনামি ডং বা প্রায় ১১.৫ মিলিয়ন ডলার। অথচ সরকারিভাবে তাকে মাত্র ৩ বিলিয়ন ডং ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, যা তার বাড়ির প্রকৃত মূল্যের মাত্র ১ শতাংশ।
থানের মতো আরও হাজার হাজার মানুষ হানোইয়ের ১০০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনার শিকার হচ্ছেন। এই প্রকল্পের আওতায় রাজধানী শহরের প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এই তাড়াহুড়ো স্থানীয়দের চরম সংকটে ফেলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের সাথে কোনো ধরনের পরামর্শ ছাড়াই উচ্ছেদ চালানো হচ্ছে এবং পুনর্বাসন এলাকাগুলোও বসবাসের উপযোগী নয়।
ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব 'জাতীয় উত্থানের যুগ' স্লোগানকে সামনে রেখে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য পূরণে ভূমিকে উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণের আইনগুলো নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ভূমি আইনের সংশোধনীগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থকে জনগণের স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে হানোইজুড়ে প্রায় ১,৪২৮টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। রেড রিভার সিনিক অ্যাভিনিউ করিডোর প্রকল্প, Bắc Ninh প্রদেশের জিয়া বিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ডং নাই প্রদেশের লং থান বিমানবন্দর প্রকল্পসহ বড় বড় উদ্যোগের জন্য ব্যাপক হারে ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী অভিযোগের প্রায় ৭০ শতাংশই ভূমি সংক্রান্ত।
সরকারের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতা করা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ভিয়েতনামের আইন অনুযায়ী, এসব উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে তা 'শত্রুভাবাপন্ন' হিসেবে দেখা হয়। অতীতে ল্যু বিন ন্যুং-এর মতো আইনপ্রণেতারা ভূমি দখলের বিরুদ্ধে সরব হলেও বর্তমানে তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ল্যু বিন ন্যুং-কে দুর্নীতির অভিযোগে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা অনেকের মতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।
উচ্ছেদের শিকার মানুষরা এখন নিজেদের অধিকার রক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নিচ্ছেন। তবে কঠোর সেন্সরশিপের কারণে তারা সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারছেন না। অনেকেই এখন গণতন্ত্রের দাবিতে সোচ্চার হওয়া বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হচ্ছেন। ক্যান থি থিউ-এর মতো কর্মীরা ভূমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাদের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনামের এই উন্নয়ন মডেল একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাসস্থানের নিরাপত্তার ওপর বিশাল প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে।


























