স্টার ওয়ার্স খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ লুকাস লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর নতুন আর্ট মিউজিয়াম বা শিল্পকলা জাদুঘর উন্মোচন করেছেন। বুধবার এই জাদুঘরটির বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি অসম্ভব কাজ করতে অভ্যস্ত, তবে এটি প্রায় আমার ইচ্ছাশক্তিকে ভেঙে ফেলেছিল।"
১ লাখ বর্গফুটের এই বিশাল গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে ব্যাঙ্কসি, নরম্যান রকওয়েল, ডিয়েগো রিভেরা এবং ফ্রিদা কাহলোর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের কাজ। এছাড়া রয়েছে 'দ্য উইজার্ড অব ওজ'-এর কাওয়ার্ডলি লায়ন (ভীতু সিংহ)-এর মূল পোশাক এবং কমিক স্ট্রিপ অ্যাস্টেরিক্স ও গারফিল্ডের আঁকা ছবি। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্নধর্মী এই শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে সাধারণ মিল হলো—এগুলো কোনো না কোনো গল্প বলে। লুকাসের স্ত্রী ও জাদুঘরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মেলোডি হবসন সাংবাদিকদের বলেন, একটিমাত্র ফ্রেমের মাধ্যমে গল্প বলাই এই শিল্পকর্মগুলোর মূল উদ্দেশ্য।
জাদুঘরের সিনিয়র কিউরেটর রায়ান লিংকফ বলেন, চাক্ষুষ বা ভিজ্যুয়াল গল্প বলার এই মাধ্যমটি আমাদের চারপাশেই রয়েছে। খবরের কাগজের ছবি, বিজ্ঞাপন, বইয়ের প্রচ্ছদ, কমিক বুক, পোস্টার, স্ট্রিট আর্ট এবং সিনেমা—সবখানেই এটি লুকিয়ে আছে, যা আমরা অনেক সময় খেয়ালও করি না। হবসন ও লুকাস দম্পতি বিশ্বাস করেন, গল্প বলার এই প্রক্রিয়াটি মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হবসন বলেন, এই বর্ণনামূলক শিল্প আমাদের বিশ্বাস ও মিথগুলোকে ফুটিয়ে তোলে। লুকাস যোগ করেন, ছবিগুলো সেই মিথগুলোকে বাস্তব রূপ দেয়, যা মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন বিশ্বাস গড়ে তোলে এবং তাদের একসঙ্গে কাজ করতে ও একে অপরকে হত্যা না করে শান্তিতে থাকতে সাহায্য করে।
জাদুঘরটির নিচতলায় রয়েছে হাজার বছরের ভিজ্যুয়াল গল্প বলার ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত সফর। গুহাচিত্রের একটি নিমগ্ন পুনর্নির্মাণ দিয়ে এটি শুরু হয়ে প্রাচীন সভ্যতা ও বাইবেলের গল্প চিত্রিত করা পেইন্টিং, মোজাইক এবং ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়েছে। এরপর গোলাকার কাঁচের লিফটের মাধ্যমে জাদুঘরের মূল সংগ্রহে পৌঁছানো যায়, যা মূলত ২০ এবং ২১ শতকের শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো। এই লিফটে চড়লে এক ধরনের 'স্টার ওয়ার্স' অনুভূতি পাওয়া যায়।
এখানকার গ্যালারিগুলো বেশ কয়েকটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। কিছু কক্ষ নির্দিষ্ট মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; যেমন কমিকস কক্ষে রয়েছে ক্রেজি ক্যাট, লিটল অরফ্যান অ্যানি, দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব টিনটিন এবং সুপারম্যানের স্ট্রিপ। শিশুতোষ গল্পের কক্ষে রয়েছে 'হোয়ার দ্য ওয়াইল্ড থিংস আর'-এর শিল্পকর্ম এবং রূপকথার চিত্রকর্ম। আবার মাঙ্গা কক্ষে স্থান পেয়েছে অ্যাস্ট্রো বয় ও পিকাচুর প্রতিকৃতি।
অন্যান্য কক্ষগুলো থিম বা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সাজানো। 'কমিউনিটি' বা সম্প্রদায় বিভাগে রয়েছে আর্নি বার্নসের আশেপাশের দৃশ্যাবলী এবং ফ্রিদা কাহলোর একটি সেলফ-পোর্ট্রেট। 'শৈশব' বিভাগে রয়েছে মার্গারেট কিন-এর আঁকা 'চিলড্রেন অব প্যারিস' এবং পিকাসোর আঁকা 'লিটল গার্ল'। 'নাগরিক জীবন' বিভাগে রয়েছে ১৯৬৮ সালের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ধর্মঘটের ছবি এবং অভিবাসন বিরোধী অভিযানের প্রতিবাদে শেপার্ড ফেয়ারি ও আর্নেস্টো ইয়েরেনা মন্তেহানোর আঁকা একটি পেইন্টিং।
এছাড়া রয়েছে একটি বিশাল ম্যুরাল রুম। লস অ্যাঞ্জেলেস নদীর তীরে অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে জুডিথ বাাকার ম্যুরালটির একটি ভিডিও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশেই রয়েছে ব্যাঙ্কসির দেয়াল কেটে আনা বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কাজ। ফরাসি শিল্পী জেআর-এর 'কিকিতো' নামক একটি বিশাল ছবিও রয়েছে এখানে, যেখানে একটি শিশুকে মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্ত প্রাচীরের ওপর দিয়ে উঁকি দিতে দেখা যায়।
জাদুঘরের প্রতিটি শিল্পকর্মের পাশে একটি ছোট ফলকে কেবল তার নাম, সাল, শিল্পীর নাম এবং ব্যবহৃত উপকরণের বিবরণ রয়েছে। তবে দেয়ালে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা বা দীর্ঘ বর্ণনা দেওয়া হয়নি। কিউরেটর লিংকফ জানান, এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। কিউরেটর ও লুকাস চাননি দর্শনার্থীরা কোনো পূর্বনির্ধারিত ধারণা নিয়ে শিল্পকর্মগুলো দেখুক। দর্শনার্থীরা যেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এগুলো উপভোগ করতে পারে এবং তাদের নিজস্ব অনুভূতি তৈরি করতে পারে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা। তবে কেউ যদি কোনো কাজের উৎস বা প্রেক্ষাপট জানতে চান, তবে ফোনে ছবিগুলো স্ক্যান করে সংক্ষিপ্ত বিবরণী জেনে নিতে পারবেন।
জাদুঘরের নেতৃত্ব জোর দিয়ে বলেছেন যে, এখানকার অনেক শিল্পী সুপরিচিত হলেও তারা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের মতো সম্মান পান না। যেমন জন রোমিতা জুনিয়রের স্পাইডার-ম্যানের প্যানেলগুলো সাধারণত এমন জাদুঘরে দেখা যায় না যেখানে সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদও স্থান পায়। উল্লেখ্য, সিস্টিন চ্যাপেলকে এখানে ব্যাকলিট ফটোগ্রাফির মাধ্যমে পুনর্নির্মিত করা হয়েছে, যাকে লুকাস ও হবসন 'ঈশ্বরের প্রথম কমিক বুক' বলে অভিহিত করেছেন। জাদুঘরের সিইও ট্রেসি বেটস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নরম্যান রকওয়েলকে তাঁর সময়ে প্রকৃত শিল্পী হিসেবে গণ্য না করে কেবল একজন বিজ্ঞাপন চিত্রকর ভাবা হতো। কিন্তু তাঁর কাজের গভীরতা অসাধারণ এবং তিনি অন্যতম সেরা গল্পকার। বেটস আরও বলেন, "আমাদের মধ্যে কতজন মরিস সেনডাকের কাজের মাধ্যমে ভয়কে জয় করতে শিখেছি, কিংবা ইএইচ শেপার্ডের আঁকা ১০০ একর উডের ছবি দেখে নৈতিক শিক্ষা পেয়েছি? জর্জ এটিকে 'জনগণের শিল্প' বলেন এবং এই জাদুঘরই হচ্ছে তার আসল ঠিকানা।"




























