শরীয়তপুরের পদ্মা, মেঘনা ও কীর্তিনাশাসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও প্লাবনভূমিতে অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে ধ্বংসাত্মক ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। এর ফলে একদিকে যেমন আশঙ্কাজনক হারে কমছে মাছের উৎপাদন, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে এই অঞ্চলের জলজ জীববৈচিত্র্য। এই পরিস্থিতির কারণে জেলাটির প্রায় ৩০ হাজার জেলের জীবন ও জীবিকা এখন চরম সংকটের মুখোমুখি। নদী ও খাল থেকে আহরিত এসব মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকার বাজারেও সরবরাহ করা হয়, কিন্তু ক্ষতিকর জালের দাপটে এখন মাছের আকাল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে নদীতে গিয়েও এখন আর আগের মতো মাছ মিলছে না। চায়না দুয়ারি জালের সূক্ষ্ম ফাঁদে আটকা পড়ছে রেণু পোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছ। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও সামগ্রিক উৎপাদন। নদী ছাড়িয়ে খাল-বিল ও ছোট জলাশয়েও এই জালের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ায় মাছের নিরাপদ প্রজননক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, অনেক জেলে এখন বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
ক্ষতিকর এই জালের কুপ্রভাব কেবল মাছের ওপরই পড়ছে না, বরং নদী ও খালের সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। চায়না দুয়ারিতে মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া, চিংড়ি, ব্যাঙসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এর ফলে নদীবিধৌত শরীয়তপুর জেলার সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য এখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন।
বাস্তবতা হলো, ক্ষতিকর জেনেও অনেক স্থানীয় জেলে নিরুপায় হয়ে এই জাল ব্যবহার করছেন। এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। অনেক জেলে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, চায়না দুয়ারির ব্যবহার অন্যায় ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু ঋণের বোঝা এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে বিকল্প কোনো পথ না পেয়ে তারা এই ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণে অনতিবিলম্বে নদ-নদীতে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে জোরালো অভিযান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই ক্ষতিকর জাল উৎপাদনকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং এর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি দিয়েই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জেলেদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদি আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যাতে অভাবের তাড়নায় তারা পরিবেশ ধ্বংসের পথ বেছে না নেন।























