ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় লাখ লাখ মানুষের ঘরে এখনও পৌঁছায়নি পাইপলাইনের পানি। তীব্র পানির সংকটের পাশাপাশি শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত তলিয়ে যাওয়া মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে। গবেষকদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়েও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনই এই শহরটি তলিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। এই সংকট এতটাই তীব্র যে, দেশটির রাজধানী পূর্ব কালিমান্তানের নুসানতারায় স্থানান্তরের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সরকারকে।
উত্তর জাকার্তার পেনজারিনগানের মুয়ারা আংকে নামক একটি মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের এলাকায় প্রতি কয়েক দিন পর পর নীল রঙের পানির ট্যাঙ্কার এসে পৌঁছায়। গাড়িটি আসতেই হাড়ি-পাতিল ও প্লাস্টিকের পাত্র নিয়ে ছুটে আসেন বাসিন্দারা। এই দরিদ্রতম এলাকায় পানির ট্রাকই একমাত্র ভরসা। স্থানীয় পানির দোকানদার এল্লাহ বলেন, "পানি সরবরাহ বন্ধ হলে জীবন অচল হয়ে পড়ে। একবার টানা সাতদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষ গোসল ও রান্নার কাজ পর্যন্ত করতে পারেনি।" এখানে প্রায় ২০০ পরিবারের বাস, যাদের কাঠের তৈরি ঘরগুলো জোয়ারের পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৬ সালে এল্লাহ নিজেই একটি ক্ষুদ্র পানি বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি ৮ হাজার লিটারের একটি ট্যাঙ্কার কিনে তা পাইপের মাধ্যমে ১৫টি প্রতিবেশী পরিবারে বিক্রি করেন।
তবে এই পানির মূল্য অনেক চড়া। রান্নাবান্না ও গোসলের জন্য পানি কিনতেই অনেক পরিবারের মাসে প্রায় ৬ লাখ রুপিয়াহ (৩৩ ডলার) খরচ হয়ে যায়, যেখানে এই এলাকার গড় মাসিক আয় মাত্র ১৫ থেকে ৩০ লাখ রুপিয়াহ (৮০ থেকে ১৬০ ডলার)। এল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের মনে হয় শহরের এক কোণে অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে।" পাশেই বসবাসকারী ৬৮ বছর বয়সী সাবেক জেলে হুসনিক প্রতি তিন দিনে ধোয়া-মোছা ও রান্নার পানির জন্য ৪০ হাজার রুপিয়াহ খরচ করেন। তিনি বলেন, "পানি পাওয়া আমাদের নাগরিক অধিকার এবং এটি সরবরাহ করা সরকারের দায়িত্ব।" পেনজারিনগানের ৪৬ বছর বয়সী নানি সাদিয়া স্থানীয় একটি মসজিদ থেকে পাইপের মাধ্যমে মাসে ১৫০ হাজার রুপিয়াহ খরচে পানি পান। পাম্প নষ্ট হলে তাকে দৈনিক ৩০ হাজার রুপিয়াহ (১.৭০ ডলার) দিয়ে পানি কিনতে হয়, যা তার পরিবারের জন্য এক বিশাল বোঝা।
অন্য দিকে, মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে রাওয়াবাদান সেলাতানের বাসিন্দারা দুই বছর আগে পাইপলাইনের সংযোগ পেয়েছেন। এর আগে তারা দূষিত ও লবণাক্ত নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা ওয়ালিমা বলেন, "এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। আগের নলকূপের পানিতে আমাদের চুলকানি হতো, তাই পরিষ্কার পানি দিয়ে আবার শরীর ধুতে হতো।" জাকার্তায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এই দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতা একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দিয়েছে। মাটি থেকে পানি তোলার কারণে জমি দেবে যাচ্ছে, ফলে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন ফেটে পানি লিক হচ্ছে। জাকার্তার সরকারি পানি সরবরাহ সংস্থা 'পাম জয়া' (PAM JAYA) জানায়, পরিশোধিত পানির প্রায় ৫০ শতাংশই লিকের কারণে নষ্ট হয়ে যায়, যা পরিকাঠামো সংস্কারের রাজস্ব কমিয়ে দিচ্ছে।
তারুমানাগারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ওয়াহইউ কুসুমা আস্তুতি জানান, এই সমস্যার মূল রয়েছে ওলন্দাজ (ডাচ) ঔপনিবেশিক আমলে। তখন পাইপলাইন শুধু ইউরোপীয়দের এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, স্থানীয় ইন্দোনেশীয়রা শুরু থেকেই বঞ্চিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর আমলে ব্রিটিশ সংস্থা 'টেমস ওয়াটার' এবং ফরাসি সংস্থা 'সুয়েজ'-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে পানি সরবরাহ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল ৯৮ শতাংশ মানুষের কাছে পানি পৌঁছানো, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। ইন্দোনেশিয়ার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাবিদ আদে হেন্দ্রাপুত্রার ২০১৬ সালের একটি গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থার ফলে একটি "শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা" তৈরি হয়েছিল। ফলে ধনী পরিবার ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নলকূপ বসিয়ে পানি তুলতে শুরু করে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারওয়া বলেন, পানিকে জনসেবার চেয়ে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি কিনতেই ব্যয় করে এবং পানি সংগ্রহের মূল বোঝা নারীদের ওপরই পড়ে। দশকের পর দশক ধরে চলা ক্ষোভের পর ২০২৩ সালে একটি নাগরিক মামলার প্রেক্ষিতে জাকার্তার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে (PAM JAYA) ফিরিয়ে আনা হয়। তবে মারওয়া মনে করেন, আর্থিক কাঠামোর তেমন পরিবর্তন হয়নি, যা সার্বিক সংযোগ দেওয়ার চেয়ে বেসরকারি খাতের ঝুঁকি কমানোকেই প্রাধান্য দেয়। ওয়াহইউ কুসুমা আস্তুতির মতে, পাম জয়া এখনও আগের বাণিজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে বাঁধা। বেসরকারি কোম্পানিগুলো কম ঝুঁকিপূর্ণ পানি শোধনাগারে বিনিয়োগ করছে, আর পাইপলাইন প্রতিস্থাপনের বিশাল খরচ সরকারি সংস্থাকেই বহন করতে হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'ওয়ালহি' (WALHI)-র জাকার্তা শাখার নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ আমিনুল্লাহ বলেন, শুধু পাইপলাইন বাড়ালেই সংকট মিটবে না, পানির গুণগত মান ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক পরিবার পাইপলাইনের পানিকে বিশ্বাস করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যিক খাত যেমন হোটেল ও শিল্প কারখানাগুলো গভীর নলকূপ ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ক্ষতি করছে, যা সাধারণ মানুষের অগভীর নলকূপের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। আমিনুল্লাহর মতে, "পানি মানুষের একটি মৌলিক অধিকার যা রাষ্ট্রের পূরণ করা উচিত, কোনো মুনাফাভোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়।" পাম জয়া সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি না হলেও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে শতভাগ পরিবারে পাইপলাইনের পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে তারা। ২০২৫ সালে তারা ৭২,০০০ নতুন সংযোগ দিয়েছে, যার ফলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পরিধি ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।





















