তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান যুদ্ধবিরতির প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। যদিও ওমান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা চলছে, তবুও ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি একটি চুক্তির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যা তার ভাষায় ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ হিসেবে পরিচিত। তবে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্থগিত হওয়ার পর থেকে তারা সামরিক সরঞ্জাম মেরামত, নতুন সরঞ্জাম আমদানি এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে অস্ত্র তৈরির কাজ জোরদার করেছে।
ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানিয়েছেন, তারা এই যুদ্ধবিরতির সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন। তিনি আরও জানান, নতুন প্রজন্মের ড্রোনগুলো ইতিমধ্যে যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহার করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে সেগুলোর কারিগরি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হবে।
ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা গত মাসে দাবি করেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। তার ভাষ্যমতে, ড্রোন উৎপাদন যুদ্ধের আগের তুলনায় তিনগুণ বেড়েছে। শীর্ষ কমান্ডারদের হারানোর পরও ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের গতি, কৌশল এবং সক্ষমতার মাধ্যমে শত্রুকে চমকে দিতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির সময় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সেগুলোর নির্ভুলতাও বাড়ানো হয়েছে। যদিও আইআরজিসি তাদের অস্ত্রের মজুত বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করেনি।
জুন মাসে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান তাদের যুদ্ধের আগের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং ড্রোন ভাণ্ডারের ৪০ শতাংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান হরমুজ প্রণালীসহ অন্যান্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অসম যুদ্ধে টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে।
যুদ্ধের শুরু থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানগুলো ইরানের আকাশসীমায় হাজার হাজার অভিযান চালিয়েছে। এর বিপরীতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা বেশ কিছু ক্রুজ মিসাইল এবং মার্কিন এমকিউ-৯ ও এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরান চীন থেকে ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার পেতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে, যদিও চীন ও পাকিস্তান তা অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে ইরান কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার হোসেইন কানানি মোঘদ্দাম আল জাজিরাকে জানান, হাজার হাজার হামলা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেন, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও ধ্বংসক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক উন্নত করা হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ গোপন ঘাঁটিতে নতুন অস্ত্রের মজুত রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির মতো বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিলেও পরে তা বাতিল করেছে। তবে এই বিরতি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও মার্কিন শেয়ার বাজারে সাময়িক প্রভাব ফেললেও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমেনি।
মঙ্গলবার ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের নাজরান বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার দাবি করেছে। একই দিনে লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হোদাইদাহর কাছে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ বিস্ফোরকবাহী নৌকার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে জাহাজের ১৪ নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার ওমানের খাসাব থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাল্কার জাহাজের ইঞ্জিন রুমে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরান কিছু জাহাজকে তাদের জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিলেও, দক্ষিণ রুট ব্যবহার না করার জন্য সতর্ক করেছে।
কানানি মোঘদ্দাম জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন স্থল অভিযান ইরানের দ্বীপগুলো সাময়িকভাবে দখল করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। তার মতে, সামরিক হামলার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা সম্ভব নয়, কারণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরো দেশজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা































