গাজা সিটির সাবরা এলাকায় সোমবার রাতে লারা আবু শরিয়া ঘুমাতে পারেননি। প্রতিটি মুহূর্ত যেন তার কাছে দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। যখনই তিনি চোখ বন্ধ করছিলেন, তখনই তার প্রিয়জনদের মুখচ্ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। ৩৯ বছর বয়সী লারা তার ফোনে থাকা প্রিয়জনদের ছবিগুলো বারবার স্ক্রল করছিলেন, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই শেষ বিদায়ের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন।
২০২৩ সালে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় আয়োজিত সবচেয়ে বড় গণকফন অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। গাজা সিটির সাবরা এলাকায় আবু শরিয়া ও আল-হাসাইনা পরিবারের ১১২ জন সদস্যের দেহাবশেষ সমাহিত করা হয়, যা প্রায় তিন বছর আগে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিল।
যখন দেহাবশেষ বহনকারী সাদা ব্যাগগুলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার স্থানে পৌঁছায়, তখন লারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার চারপাশে অন্যান্য শোকাতুর স্বজনরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। লারা বলেন, ‘আজকের দিনটি যেন সেই হারানোর প্রথম দিনের মতো মনে হচ্ছে। এভাবে শেষ বিদায় জানানোটা নতুন করে শোক জাগিয়ে তুলেছে।’
লারার জন্য এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল তার প্রায় পুরো পরিবারকে হারানোর নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর সাবরায় পারিবারিক কম্পাউন্ডে ইসরায়েলি বিমান হামলায় লারার ১৪ জন নিকটাত্মীয় নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার মা নাওয়াল, চার ভাই, চার বোন এবং বেশ কয়েকজন ভাগ্নে ও ভাগ্নি। লারা বলেন, ‘আমার পরিবার এক মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিল।’
যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্দেশে লারা তার স্বামী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা সাবরায় থেকে গিয়েছিলেন। লারা জানান, দক্ষিণে থাকাকালীন তিনি সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতেন। সুযোগ পেলেই তিনি তার বোনদের সাথে সংক্ষিপ্ত ফোনে কথা বলে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন।
এক রাতে লারা খবর পান যে সাবরায় বিমান হামলা হয়েছে। তিনি তার বোনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। তিনি বারবার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন, এই আশায় যে হয়তো যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে কোনো উত্তর আসছে না। পরে তার স্বামী একটি কল পান, যেখানে জানানো হয় যে তাদের পারিবারিক ভবনটি ধ্বংস হয়েছে এবং সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।
লারা বলেন, ‘কখনও কখনও আমার মনে হয় হয়তো কেউ আহত অবস্থায় সাহায্যের অপেক্ষায় ছিল। হয়তো কাউকে বাঁচানো সম্ভব হতো। ধ্বংসস্তূপের নিচে তাদের শ্বাসরোধ হওয়ার কথা ভেবে আমি প্রায় পাগল হয়ে যাই।’ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ গাজা থেকে ফিরে তিনি সরাসরি হামলার স্থানে ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে বলছিলাম হয়তো তারা আমার সাথে মজা করছে, হয়তো কেউ লুকিয়ে আছে।’
ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স দল কয়েক সপ্তাহ ধরে সাবরার ধ্বংসস্তূপ থেকে দেহাবশেষ উদ্ধারের জটিল অভিযান চালায়। মোট ১৫৩ জন নিখোঁজের মধ্যে ১১২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও প্রায় ৮ হাজার মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে।
বাসাল জানান, ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজায় উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠাক, যাতে সিভিল ডিফেন্স দলগুলো এই মানবিক দায়িত্ব পালন করতে পারে।’ অনেক দেহাবশেষ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় শনাক্তকরণও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
লারা উদ্ধার অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার জেদ ধরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, আমি দেখতে চাই। এমনকি যদি শুধু একটি হাড়ও অবশিষ্ট থাকে, আমি তা দেখতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সেই ব্যাগটি জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম, তাদের যা অবশিষ্ট ছিল তা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম।’
লারার আত্মীয় ৫০ বছর বয়সী আলী আবু শরিয়া জানান, হামলার সময় তিনি দক্ষিণ গাজায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘খবর আসতে শুরু করল, এক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, তারপর আরেকটা। আমি আমার দুই ভাই আহমদ ও মুইন এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়েছি।’
আলী জানান, হামলার শিকার ব্যক্তিরা মুফিদ আল-হাসাইনার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তারা ভেবেছিল তারা নিরাপদ, কিন্তু যুদ্ধ মেশিন বেসামরিক নাগরিক বা বাড়িঘর কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেনি। তারা ছিল সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী।’
আলী আরও জানান, এই হামলায় সাতটি পরিবার পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। লারা এবং আলীর মতো হাজারো ফিলিস্তিনি আজ তাদের প্রিয়জনদের দেহাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে সেই ভয়াবহ দিনটির কথা স্মরণ করছেন, যা তাদের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা





























