১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শরতের এক সকালে ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুতে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল শূন্যতা। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর এই রহস্যজনক মৃত্যুর পর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলছে আইনি লড়াই। পারিবারিক নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরীর বড় ছেলে ছিলেন সালমান শাহ। তাঁর মৃত্যুর পর বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন, তবে পরিবার শুরু থেকেই একে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিল। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তদন্তে হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা মামলায় রূপ নেবে।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে গত বছর ২১ অক্টোবর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু, রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ এবং খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন। মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এই মামলার ৪ নম্বর আসামি ৫৪ বছর বয়সী অভিনেতা ডনকে সম্প্রতি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং পরে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে। আজ তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান। আবেদনে বলা হয়, ডন দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন এবং অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেন। শুনানি শেষে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে জানান, ১৯৯৭ সালে ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টার মামলায় আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে, সামিরা হকের সঙ্গে ডনের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। ডন, ফারুক ও রেজভি ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে সালমান শাহকে অচেতন করে পরে আত্মহত্যা দেখানোর জন্য ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর একাধিক তদন্তে একে ‘আত্মহত্যা’ বলা হলেও তাঁর মা নীলা চৌধুরী আইনি লড়াই ছাড়েননি। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে একে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে। এরপর ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয় এবং ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট দাখিল করা প্রতিবেদনেও একে অপমৃত্যু বলা হয়। ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল নীলা চৌধুরী পুনরায় রিভিশন আবেদন করেন এবং ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে জানায়, সালমান শাহকে খুন করা হয়নি। ২০২১ সালের অক্টোবরে এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করা হয়, যার প্রেক্ষিতে গত বছর ২০ অক্টোবর আদালত হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।
ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর মামলার বাদী ও সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম সন্তোষ প্রকাশ করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, ডন এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি আশা করছেন, এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মূল আসামিসহ ঘটনার সব রহস্য উন্মোচিত হবে।

























