যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা চলা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ইরানি নাগরিকদের সেদেশে ফেরত পাঠাতে (ডিপোর্ট করতে) মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তেহরানের সঙ্গে গোপনে কাজ করেছিলেন। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু ইমেইল থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই ইমেইলগুলো থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোন কোন ইরানি অভিবাসীকে ফেরত পাঠানো হবে, তা নির্ধারণে ইরানি কর্মকর্তাদের প্রভাব ছিল এবং তেহরানের অনুরোধে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তারা শেষ মুহূর্তে তালিকায় পরিবর্তনও করেছিলেন।
ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম ডিপোর্টেশন ফ্লাইটটি ছেড়ে যাওয়ার প্রায় এক মাস আগে, আগস্টের শেষের দিকে একজন বেনামী আইসিই কর্মকর্তা লিখেছিলেন, "ইরানি দূতাবাসের অনুরোধে আমি কয়েকটি নাম যুক্ত করেছি।" এর এক সপ্তাহ পর, একই পদের আরেকজন কর্মকর্তা ইরানি দূতাবাসের পরিচালকের সাথে বৈঠকের পর তালিকায় আরও কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি লিখেছিলেন, "ইরান আগের তালিকা সংশোধন এবং ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার অনুরোধ করেছে।" এমনকি ফ্লাইটের মাত্র তিন দিন আগে, ২৬ সেপ্টেম্বরের এক ইমেইলে দেখা যায়, ইরানি দূতাবাস আরও তিনজনকে ফ্লাইটে নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ফ্লাইটটি নির্ধারিত পরিকল্পনার চেয়ে অনেক ছোট আকারে ছেড়েছিল। কাতারি কর্মকর্তারা দোহার মাধ্যমে এই চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করেছিলেন। তবে সমন্বয়ে ত্রুটির কারণে কাতারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও এক ইরানি নাগরিককে ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা নিজেরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালেও এই ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৬ জুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে "সবার অবিলম্বে তেহরান ত্যাগ করা উচিত!" বলে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরপরই আইসিই-এর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক টড লায়ন্স এই কার্যক্রমকে "অগ্রাধিকার" হিসেবে ঘোষণা করেন। যদিও সে সময় আকাশসীমা বন্ধ থাকা এবং যুদ্ধের কারণে ইরান ভ্রমণ নথি ইস্যু না করায় প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, তবুও আইসিই-এর রিমুভাল অপারেশনস প্রধান মার্কোস চার্লস কর্মকর্তাদের দ্রুত পরিকল্পনা তৈরি করতে নির্দেশ দেন এবং কাস্টডিতে থাকা ৫৮ জন ইরানিকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই যুদ্ধটি ২০২৫ সালের ১৩ জুন থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এবং এর কয়েক মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এই যৌথ তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের দীর্ঘ নীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী ও নির্বাসিতদের আশ্রয় দেওয়া হতো। মানবাধিকার কর্মীরা এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন, কারণ ইরানে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটি চুক্তির আওতায় প্রায় ৪০০ ইরানিকে ফেরত পাঠানো হতে পারে, যাদের বেশিরভাগই মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিলেন। তবে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন নাকি তাদের বাধ্য করা হয়েছিল, তা ইমেইলগুলো থেকে স্পষ্ট নয়। যদিও পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল যে, আশ্রয়ের আবেদনকারীদেরও তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, এই ইমেইলগুলো ট্রাম্পের সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে যেখানে তিনি বলেছিলেন যে সাধারণ ইরানিদের স্বৈরাচারী শাসন থেকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র লড়াই করছে। তিনি বলেন, "এটি প্রমাণ করে যে যেকোনো উপায়ে যত বেশি সম্ভব মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।" এনআইএসি-এর পলিসি ডিরেক্টর রায়ান কস্টেলো এই অভিযানের বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জবাবদিহিতা দাবি করেছেন।
এছাড়াও, ইমেইলগুলোতে দেখা গেছে যে আইসিই কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে আটক ইরানিদের সাথে ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন। ওয়াশিংটন ডি.সি.-র একটি আদালতে জুলাই মাসে দায়ের করা মামলায় ১১ জন ইরানি বন্দি অভিযোগ করেছেন যে, তাদের জোর করে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যারা তাদের আশ্রয়ের আবেদনের অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য জানত। মামলাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে মার্কিন ইমিগ্রেশন সংস্থাগুলো বেআইনিভাবে আশ্রয়ের আবেদনকারীদের গোপন তথ্য ইরানি সরকারের সাথে শেয়ার করেছে। যদিও মার্কিন আইন অনুযায়ী আশ্রয়ের আবেদনকারীদের গোপন তথ্য অন্য দেশের সরকারের সাথে শেয়ার করা নিষিদ্ধ, তবে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে "মিথ্যা" বলে দাবি করেছে।






























