বিআরটিসির নতুন ‘পিংক বাস’ সেবার নারী চালকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচার এবং কুৎসিত ট্রলের শিকার হচ্ছেন। তবে এসব হেনস্তা ও ঠাট্টাবিদ্রূপের মুখেও তাঁরা দমে যেতে রাজি নন। গত মঙ্গলবার ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নারী কর্মী পরিচালিত ১৩টি রুটে ১৪টি বাস চালু করার পর থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকার মতিঝিল বিআরটিসি বাস ডিপোতে গিয়ে এই নারী চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাঁদের আক্ষেপ, চ্যালেঞ্জ ও দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা।
২৮ বছর বয়সী খাদিজা আক্তার আগে ছিলেন সাধারণ গৃহিণী। ২০২১ সালে বিআরটিসি থেকে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে পরে তিনি নিজেই প্রশিক্ষক হন। বর্তমানে তিনি এই পিংক বাসের চালক। তিনি আক্ষেপ করে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ব্যবহার করে আজেবাজে মন্তব্য ও ট্রল করা হচ্ছে। খাদিজা বলেন, "কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে না নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করছেন। আমি তাঁদের বলতে চাই, কোনো প্রতিবন্ধকতা দিয়ে আমাদের দমাতে পারবেন না। আমরা সব ক্ষেত্রে সফলভাবে কাজ করে যাব।" তিনি আরও জানান, পরিবার, চাকরিজীবী স্বামী ও বাবার বাড়ির পূর্ণ সমর্থনে তিনি এ পেশায় এসেছেন। নারী যাত্রীদের ভালোবাসাও তাঁকে শক্তি জোগায়।
আরেক চালক মোসাম্মৎ সাথী খাতুন (৩০) ডিগ্রি পাসের পর ৬ বছর আগে বিআরটিসিতে প্রশিক্ষণ নেন। মানিকগঞ্জে দুই বছর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি এমএ পাস করেছেন এবং বর্তমানে এলএলবি পড়ছেন। সাভার ইপিজেড এলাকায় স্বামী ও সন্তান নিয়ে বসবাসকারী সাথী মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিল রুটে বাস চালাচ্ছেন। তাঁর ভাবি তাসলিমা পারভীনও বগুড়ায় পিংক বাসের চালক। সাথী জানান, তাঁর ট্রাকচালক স্বামী ও ভাই এবং বাবা তাঁকে সবসময় সাহস জুগিয়েছেন। আজেবাজে মন্তব্যে কান না দিয়ে তিনি বলেন, "মানুষের কথা কানে নিলে জীবনে উন্নতি করা যাবে না। আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে, আমরা ভালো করব।"
তিতুমীর কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর করা মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুনও একজন নারী চালক। ২০১২ সালে ব্র্যাকের একটি প্রকল্প থেকে বিনামূল্যে গাড়ি চালানো শিখে তিনি ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন। এরপর বিআরটিসিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০২৪ সালে ভারী যানবাহনের লাইসেন্স পান। রাবেয়া বলেন, "নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হবে, সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই এ পেশায় এসেছি। সড়কে সবাই ট্রাফিক নিয়ম মেনে চললে চালকদের এত চ্যালেঞ্জ পোহাতে হতো না।" স্বামী ও সন্তান নিয়ে মোহাম্মদপুরে থাকা রাবেয়া মনে করেন, নারীদের আয়ে তাদের ক্ষমতায়ন হয় এবং সংসারে সচ্ছলতা আসে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আরও কয়েকজন নারী চালক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদেরও পরিবার ও স্বজন রয়েছে এবং এ ধরনের ট্রল তাঁদের সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৫ জন চালক ও ২৪ জন নারী কনডাক্টর নিয়ে এই সেবা চলছে এবং তদারকির জন্য সাময়িকভাবে বাসে পুরুষ প্রশিক্ষক রাখা হচ্ছে। ৩২ আসনের নতুন ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস যুক্ত হওয়ার আগে প্রচার কিছুটা কম থাকুক—এমনটাই চাইছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।




























