পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিপুল ঋণ নেওয়া দেশের অন্যতম শীর্ষ ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ এখন মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা, অপরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং তারল্য সংকটের কারণে গ্রুপটির দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত ৪৭টি দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিটি গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪,১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রধান পাওনাদার হিসেবে এইচএসবিসির পাওনা প্রায় ২,৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ২,১০০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক পিএলসির ১,৪৪০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ১,১৬৭ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১,১৫৮ কোটি টাকা এবং ব্র্যাক ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৯৮৬ কোটি টাকা। গত ১লা জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, ২৯টি ব্যাংকে সিটি গ্রুপের ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে এবং এ বিষয়ে সমাধান খুঁজতে তিনটি শীর্ষ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সতর্ক করে বলেছেন, বড় কোনো শিল্পগ্রুপ নতুন করে খেলাপি হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। তবে আইনের মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে, একটি ব্যাংকের সাবেক এমডি ঋণ আদায়ের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সিটি গ্রুপের এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ১০৮.৫৭ একর জমির ওপর হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি শিল্প প্রকল্পে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার অপরিকল্পিত বিনিয়োগ। এই অলস বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিনিয়ত সুদ জমছে এবং গ্রুপটির দৈনিক গড় লোকসান হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের বড় পরিবর্তনের ফলেও প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসানে পড়ে। ঋণ পরিশোধের অংশ হিসেবে এখন হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং গ্রুপটির মালিকানাধীন ১৮,৮৭৫ একর আয়তনের ৮টি চা বাগানের অংশবিশেষ বিক্রির আলোচনা চলছে।
আর্থিক চাপ কাটাতে পুঁজিবাজার থেকে ১৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের সঙ্গে চুক্তি করেছে সিটি গ্রুপ। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং পার্টনার ও ব্যাংকার টু দ্য ইস্যু হিসেবে কাজ করবে ওয়ান ব্যাংক পিএলসি। সিটি গ্রুপের পরিচালক (করপোরেট) বিশ্বজিৎ সাহা জানান, ওয়ান ব্যাংকই নির্ধারণ করবে তাদের কয়টি প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, সিটি গ্রুপের মতো বড় কোম্পানির পুঁজিবাজারে আসা উচিত হলেও বর্তমানে রুগ্ণ হয়ে পড়া এই প্রতিষ্ঠানটি যদি শেয়ারবাজারে এসে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসানে ফেলে, তবে তালিকাভুক্ত না করাই ভালো। তিনি পূর্বে তালিকাভুক্ত হয়ে শূন্য ঘোষিত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের উদাহরণ টেনে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদও মনে করেন, বিনিয়োগকারী বা বাজারের ক্ষতি করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় দশকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে সিটি গ্রুপ রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার তহবিল হাতিয়ে নেয়। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং প্রশাসনিক প্রভাব ধরে রাখতে তারা নিজস্ব গণমাধ্যমকেও ব্যবহার করেছে। কিন্তু ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর ব্যাংক থেকে নতুন সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ ও সুদের ভারে গ্রুপটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পড়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের গুঞ্জনও উঠেছে। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় একটি ছোট সরিষার তেলের মিল দিয়ে সিটি গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ভোজ্যতেল, আটা, চিনি, ডাল, চালের পাশাপাশি ইস্পাত, শিপিং, চা ও গণমাধ্যমে বিনিয়োগ রয়েছে গ্রুপটির। তাদের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে তীর, বেঙ্গল, ন্যাচারাল, জীবন, কুইক বাইট ও জেলফি। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর বর্তমানে তার ছেলে মো. হাসান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে গ্রুপটি পরিচালনা করছেন।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ। ২০২৪ সালে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর সেই বিশাল ঋণের বোঝা এবং ইস্পাত, শিপিং, চা ও গণমাধ্যমের মতো নানা খাতে মাত্রাতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত বিনিয়োগ করার কারণে সিটি গ্রুপের জন্য বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রুপটি পড়েছে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে বিদেশে টাকা পাচারের গুঞ্জন ও অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।






























