তুরস্কের সাথে যৌথ উদ্যোগে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি গোলাবারুদ কারখানা চালু করেছে মঙ্গোলিয়া। এর মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেমন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, তেমনি মঙ্গোলিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতারও বিকাশ ঘটছে। গত এক দশকে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে যে ব্যাপক বহুমুখীকরণ বা বৈচিত্র্য এসেছে, এই কারখানাটি তারই একটি বড় প্রমাণ।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট খুরেলসুখ উখনা আঙ্কারা সফরকালে তুরস্কের সাথে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে মঙ্গোলিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বাটলুত দাম্বার আমন্ত্রণে উলানবাটর সফর করেন তুর্কি জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়াসার গুলের। সফরকালে তিনি দুই দেশের সামরিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মকর্তা বিনিময় কর্মসূচি জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন এবং নতুন গোলাবারুদ কারখানার উৎপাদন লাইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এর আগে ২০২৪ সালে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (MKE) মঙ্গোলিয়ার ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশনের সাথে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। জর্ডানের পর এটি এমকেই-এর দ্বিতীয় বিদেশি উৎপাদন কেন্দ্র এবং মঙ্গোলিয়ার প্রথম অভ্যন্তরীণ গোলাবারুদ কারখানা। ২০২৬ সালের আগস্টে মঙ্গোলিয়া ঘোষণা করে যে, কারখানাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বাটলুত জানান, কারখানাটিতে ইতিমধ্যে তিন ধরনের গোলাবারুদ তৈরি করা হয়েছে। মঙ্গোলীয় সরকার এখানেই থেমে থাকতে চায় না, তারা এখন একটি ড্রোন কারখানা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে।
প্রতিরক্ষা খাতে তুরস্ক দীর্ঘ সময় ধরে মঙ্গোলিয়ার একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। ১৯৯৯ সালের একটি চুক্তির আওতায় আঙ্কারা প্রতি বছর মঙ্গোলিয়ার প্রতিরক্ষা খাতে ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) ডলার অনুদান দিয়ে আসছে। এছাড়া দুই দেশ নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ ও সফর বিনিময় করে থাকে। মঙ্গোলিয়ায় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত বহুজাতিক সামরিক মহড়া ‘খান কোয়েস্ট’ (Khaan Quest)-এ তুরস্ক সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এখন গোলাবারুদ কারখানার মাধ্যমে কারিগরি সহায়তাসহ সামগ্রিক প্রতিরক্ষা শিল্পে তাদের এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
কেবল তুরস্কই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মঙ্গোলিয়া তার ‘তৃতীয় প্রতিবেশী’ দেশগুলোর সাথেও সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জাপান, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারত মঙ্গোলিয়ার সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহায়তা করছে এবং প্রতি বছর ‘খান কোয়েস্ট’ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। এছাড়া দুই দেশ প্রতি বছর ‘নোমাডিক এলিফ্যান্ট’ (Nomadic Elephant) নামক একটি যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। ২০২৫ সালে নয়াদিল্লি প্রথমবারের মতো উলানবাটরে একজন প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে নিয়োগ দেয়।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে জাপান ও মঙ্গোলিয়ার মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি’ কার্যকর হয়। এর ফলে টোকিও এখন মঙ্গোলিয়াকে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য নজরদারি ও রাডার সিস্টেম এবং অন্যান্য অ-মারাত্মক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারছে।
‘তৃতীয় প্রতিবেশী’ দেশগুলো মঙ্গোলিয়ার সামরিক বাহিনীকে আধুনিক ও বহুমুখী করতে সাহায্য করলেও, উচ্ছেদ এড়াতে দেশটি তার একমাত্র দুই প্রতিবেশী রাশিয়া ও চীনের সাথেই সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। রাশিয়ার সাথে মঙ্গোলিয়া প্রতি বছর ‘সেলেঙ্গে’ (Selenge) সামরিক মহড়া পরিচালনা করে, যা মূলত কৌশলগত অভিযান এবং সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয়। আর চীনের সাথে তারা ‘স্টেপ পার্টনার্স’ (Steppe Partners) মহড়া পরিচালনা করে, যেখানে সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ প্রশমন কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
কৌশলগতভাবে মঙ্গোলিয়া কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট বা ব্লকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে। তবে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় যখন বৃদ্ধি পাচ্ছে—যা ২০২৫ সালে রেকর্ড ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—তখন মঙ্গোলিয়াও নিজের সামরিক খাতকে আধুনিকায়নে তৎপর। তুরস্কের মতো উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্পের দেশের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মঙ্গোলিয়া কেবল আধুনিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামই পাচ্ছে না, বরং খনিজ খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার সুযোগও তৈরি করছে।




























