ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশের নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট সরবরাহ করার জেরে যুক্তরাজ্যের ড্রোন কারখানায় ‘অজ্ঞাত উৎস’ থেকে হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ক্রেমলিনের এক উপদেষ্টা। ক্রেমলিনের উপদেষ্টা আন্দ্রেই ফেদোরভ বিবিসি নিউজনাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই "আধা-সামরিক" (semi-military) জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জানিয়েছেন, তিনি আগামী মাসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। সেখানে তিনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সহায়তার বিষয়ে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করবেন। গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটিই হবে বার্নহামের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। তবে সফরের বিস্তারিত এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি। সোমবার ইউক্রেন সফর শেষে বার্নহাম বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে তাঁকে কী করতে হবে সে বিষয়ে তিনি বেশ স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন এবং রাশিয়ার ওপর চাপ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য তাদের তৈরি 'স্টর্ম শ্যাডো' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ফরাসি সংস্করণ 'স্কাল্প' (Scalp) ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশের ব্লুপ্রিন্ট ইউক্রেনের হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে ইউক্রেন নিজ দেশেই এই দূরপাল্লার অস্ত্র তৈরি করতে পারবে। রাশিয়ার সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেদোরভ জানান, যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর জনমত জরিপ, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে তীব্র চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আধা-সামরিক প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউক্রেনের জন্য ড্রোন তৈরি করছে এমন কারখানা বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কোনো আঘাত আসতে পারে। তবে এই হামলা সরাসরি রাশিয়া করবে না, বরং কোনো অজ্ঞাত উৎস থেকে করা হতে পারে।
ফেদোরভ আরও জানান, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য কারখানাগুলো ধ্বংস করার জন্য রুশ সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ব্রিটেন এই যুদ্ধে কিয়েভ সরকারের পক্ষে জড়িয়ে পড়েছে এবং তারা নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে আগুনে ঘি ঢালছে। এর জবাবে বার্নহাম প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, আসল প্রশ্ন হলো, আগুনটা কে জ্বালিয়েছিল?
সোমবার কিয়েভে বার্নহামের এই সফরটি ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সফর। সেখানে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে গঠিত 'কোয়ালিশন অফ দ্য উইলিং' (ইচ্ছুক জোট)-এর প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বার্নহামের পূর্বসূরি স্যার কিয়ার স্টারমার এই জোট গঠন করেছিলেন।
ইউক্রেন বর্তমানে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় মার্কিন প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে। তবে ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুদ কমে গেছে, যা ইউক্রেনকে রুশ হামলার মুখে অরক্ষিত করে তুলেছে। শীতের আগে জেলেনস্কি অন্তত ৩০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার আশা করছেন, কারণ শীতকালে জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্নহাম বলেন, তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে প্যাট্রিয়ট সরবরাহের ক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র বিকল্প নয়। তিনি উল্লেখ করেন, অন্যান্য অনেক অংশীদার রয়েছে যাদের ওপর যুক্তরাজ্যের প্রভাব আছে এবং তারা সাহায্য করতে পারে। এর জন্য বহুস্তরীয় আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অধিকার দেওয়ার তিন সপ্তাহ পরই ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। ট্রাম্প এক ক্যাবিনেট বৈঠকে বলেছিলেন, আমরা এতে সম্মত হইনি। আমরা এটি নিয়ে আলোচনা করছি, তবে এই ধরনের প্রযুক্তি অন্য কাউকে দেওয়া কঠিন বিষয়। এই অস্ত্রগুলো অবিশ্বাস্য এবং অন্য কাউকে এগুলো তৈরি করতে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে।
ইউক্রেন বৈঠকের পর বার্নহাম, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, তাদের জোট জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে কিয়েভের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। নেতৃবৃন্দ ইউক্রেনের শহর, বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে রাশিয়ার পরিকল্পিত ও ক্রমবর্ধমান হামলার তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে রাশিয়ার 'শ্যাডো ফ্লিট' (ছায়া নৌবহর) ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তাদের যুদ্ধের তহবিল সংকুচিত করার অঙ্গীকার করেন।
সফরের আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে বার্নহাম বলেন, ইউক্রেনের ৩৫তম স্বাধীনতা দিবসে আমি দেশটির জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, যুক্তরাজ্য আজ এবং যতক্ষণ প্রয়োজন আপনাদের পাশে থাকবে। তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের নিরাপত্তা মানেই আমাদের নিরাপত্তা। ইউক্রেনের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব রাশিয়ার অবৈধ যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে। আমরা একটি ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত পিছু হটব না।





























