দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইয়ংসান পার্কের জমিতে আবাসন প্রকল্প গড়ার সরকারি উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং প্রশাসনের এই বিতর্কিত আবাসন নীতির কারণে দেশটিতে সরকারের জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নেমেছে।
সিউলের বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছে ইয়ংসান পার্কের প্রধান আকর্ষণ হলো ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব কোরিয়া, যা বার্ষিক দর্শনার্থী সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে শান্ত সবুজ চিলড্রেনস গার্ডেন এবং নামসান পর্বত ও নামসান টাওয়ারের মনোরম দৃশ্য। কোলাহলমুক্ত এই সবুজ চত্বরটি একসময় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইয়ংসান গ্যারিসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯৫৩ সালে উত্তর কোরিয়াকে প্রতিহত করতে মার্কিন ৮ম আর্মি এখানে ঘাঁটি গাড়ে এবং ১৯৫৭ সালে টোকিও থেকে জাতিসংঘ কমান্ডও এর পাশে স্থানান্তরিত হয়। ৬৩০ একরের এই বিশাল এলাকা এবং এর বাইরের ইতাওন অঞ্চলটি সিউলের বুকে এক টুকরো আমেরিকায় পরিণত হয়েছিল।
১৯৮৯ সালে তৎকালীন দক্ষিণ কোরীয় প্রেসিডেন্ট রোহ তায়ে-উ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ হেলিকপ্টারে এলাকাটি পরিদর্শন করার পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হন। ১৯৯০ সালে সেনা স্থানান্তরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০৪ সালে সিদ্ধান্ত হয় সিউল থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ক্যাম্প হামফ্রেজে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর ২০০৭ সালে রোহ মু-হিউন সরকার 'স্পেশাল অ্যাক্ট অন দ্য ক্রিয়েশন অব ইয়ংসান পার্ক' নামক আইন পাস করে এই জমিটিকে কেবল একটি প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার বাধ্যবাকতা আরোপ করে। তবে মার্কিন বাহিনীর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ শতাংশ জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে; বাকি জমি হস্তান্তরের বিষয়টি ক্ষতিপূরণ ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পার্কের জমিতে আবাসন প্রকল্প গড়ার সরকারি পরিকল্পনা তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক নীতি নির্ধারক এক রেডিও অনুষ্ঠানে ইয়ংসান পার্কের চিলড্রেনস গার্ডেন এলাকায় বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেন। এরপর ভূমি ও অবকাঠামো মন্ত্রণালয়ও পার্কের খালি জায়গাগুলোতে আবাসন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ঘোষণা দেয়। মূলত গত ১৩ আগস্ট প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং আবাসন সমস্যা সমাধানে সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগাতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়ার পর এই তৎপরতা শুরু হয়。
দক্ষিণ কোরিয়ায় কয়েক দশক ধরে রিয়েল এস্টেট খাতের উন্মাদনা আবাসন ব্যয়কে আকাশচুম্বী করে তুলেছে, যা তরুণদের বিয়ে ও সন্তান জন্মদানের হার হ্রাসের অন্যতম কারণ। এই উন্মাদনা ঠেকাতে লি প্রশাসন কিছু কঠোর নীতি গ্রহণ করে। প্রথমত, ঋণের অনুপাত কমিয়ে দেওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে লিজের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে লিজের প্রিমিয়াম ও ভাড়া অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায় এবং লিজের তীব্র সংকট তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, সম্পত্তি কর ও কর মূল্যায়নের হার বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। এই নীতিগুলো সিউলের বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া উভয় পক্ষকেই ক্ষুব্ধ করে তোলে।
এর ফলে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর এই প্রথম প্রেসিডেন্ট লি-এর জনপ্রিয়তার হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সিউলের তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার প্রতি সমর্থনের হার নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশে। এই জনসমর্থন হ্রাসের পেছনে আবাসন সংকট এবং প্রসিকিউশন সংস্কারকে প্রধান দুটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও লি প্রশাসন তাদের মেয়াদে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি অর্থায়নের ফ্ল্যাট তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং গ্রিনবেল্ট রক্ষার নীতি থেকে সরে এসে এই উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও ইয়ংসান পার্ককে এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
ঐতিহাসিক ও প্রতীকী কারণে ইয়ংসান পার্ককে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোল বাহিনী, সপ্তদশ শতাব্দীতে চীনের কিং রাজবংশ (যারা কোরিয়ার ৫ শতাংশ জনসংখ্যাকে পাচার করেছিল) এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সাম্রাজ্যবাদী জাপানি বাহিনী এই স্থানটি দখল করে রেখেছিল। ১৯৪৫ সালে মার্কিন বাহিনী এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এটি মধ্যযুগ থেকেই কোরিয়ার বাণিজ্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির প্রবেশদ্বার হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
সিউলের মেয়র ওহ সে-হুন সরকারের এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, "ইতিহাস আমাকে ক্ষমা করবে না যদি আমি এই পার্কের সামান্য অংশকেও অ্যাপার্টমেন্টের জন্য ছেড়ে দিই।" গত ২৪ আগস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, সিউলের তিন ভাগের দুই ভাগ বাসিন্দা সরকারের এই প্রস্তাবের বিপক্ষে। এর আগে ২০১৬ সালেও পার্ক জিউন-হাই প্রশাসন এখানে জাদুঘর বানাতে চেয়ে জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পিছু হটেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পার্ক ধ্বংস করে অ্যাপার্টমেন্ট না বানিয়ে সিউলের অনুন্নত আবাসন এলাকাগুলোর আধুনিকায়ন ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনাই এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তিন দশক আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দ্রুত জমি হস্তান্তরের আলোচনা সম্পন্ন করা উচিত।






























