নরওয়ের মিয়োসটারনেট (Mjøstårnet) বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কাঠের অট্টালিকা। ১৮ তলা বিশিষ্ট এই ভবনটি মাটি থেকে ২৭৭ ফুট বা ৮৪ মিটার উঁচু। নরওয়ের ব্রুমুন্ডডাল শহরের কাছে মিয়োস হ্রদের তীরে অবস্থিত এই ভবনটি বর্তমানে আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময়। এর কাঠামো মূলত গ্লুলাম বা গ্লুড ল্যামিনেটেড টিম্বার দিয়ে তৈরি, যা অনেকগুলো কাঠের টুকরোকে শক্তিশালী আঠা দিয়ে যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। ভবনটির ভেতরে অফিস, অ্যাপার্টমেন্ট এবং ৭২ কক্ষের একটি হোটেল রয়েছে।
এই প্রকল্পের উদ্যোক্তা আর্থার বুখার্ডের মতে, এটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং পরিবেশগত পরিবর্তনের এক রাজনৈতিক বার্তা। ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর তিনি এই ভবন তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। বুখার্ড জানান, কংক্রিট ও ইস্পাতনির্ভর নির্মাণশিল্প বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের ৩৭ শতাংশের জন্য দায়ী, যার মধ্যে কেবল কংক্রিট উৎপাদন থেকেই আসে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এর বিপরীতে, কাঠ কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম, যা ভবনগুলোকে কার্বন শোষক হিসেবে গড়ে তোলে।
ভবনটির নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠ স্থানীয় বন থেকে সংগৃহীত। এর কাঠামোগত প্রকৌশলী রুন আব্রাহামসেন জানান, উচ্চতা বাড়লে বাতাসের চাপে ভবনের দুলুনি বা কম্পন সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এটি মোকাবিলায় ওপরের তলাগুলোতে কংক্রিটের আস্তরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটির নির্মাণ প্রক্রিয়া ছিল অনেকটা ফ্ল্যাট-প্যাক ধাঁচের; কারখানায় নিখুঁতভাবে তৈরি কাঠের কাঠামো কোনো ট্রায়াল ফিটিং ছাড়াই সরাসরি সাইটে এনে স্থাপন করা হয়েছে, যা কংক্রিটের তুলনায় অনেক দ্রুত।
কাঠের ভবন নিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগালেও, রুন জানান যে গ্লুলামের অগ্নিনিরোধক ক্ষমতা অনেক বেশি। আগুনের সংস্পর্শে এলে কাঠের বাইরের অংশ পুড়ে কয়লায় পরিণত হয়, যা ভেতরের অংশকে দীর্ঘক্ষণ সুরক্ষিত রাখে। নরওয়ের বড় বীমা কোম্পানিগুলোও এই ভবনটিকে অত্যন্ত নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঠের সুউচ্চ ভবন নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে। সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানেও কাঠের আকাশচুম্বী ভবনের পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানের সুমিতোমো ফরেস্ট্রি ২০৪১ সালের মধ্যে ৩৫০ মিটার উঁচু কাঠের ভবন তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বুখার্ডের মতে, স্থানীয় উপাদান ও স্থানীয় দক্ষতার সমন্বয়ে এই ধরনের নির্মাণশৈলীই ভবিষ্যতের শহর গড়ার চাবিকাঠি হতে পারে।































