কম্বোডিয়ার সিয়াম রিপ প্রদেশের পৌ গ্রামের ৬৩ বছর বয়সী সোক রিনা তার উঁচুতে তৈরি ঘরের নিচে শুকনো মাটিতে নাতি-নাতনিদের খেলা করতে দেখছেন। অথচ প্রতি বছর জুলাই মাসের এই সময়ে এলাকাটি টোনলে সাপ হ্রদের পানিতে প্লাবিত থাকার কথা। অতীতে জুন মাস থেকেই পানি বাড়তে শুরু করত এবং জুলাই নাগাদ বন ও নদী তীরবর্তী এলাকা তলিয়ে যেত, যা মাছের প্রজনন ও মৎস্যজীবীদের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কম্বোডিয়ার আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জুন ও জুলাই মাসের ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হয়ে পড়ছে, যদিও সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রচণ্ড ঝড়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মেকং অববাহিকায় ২০০টিরও বেশি বড় বাঁধের উপস্থিতি হ্রদে পানির প্রবাহকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। স্টিমসন সেন্টারের তথ্যমতে, টোনলে সাপের প্রবাহের দিক পরিবর্তনের সময় এবার প্রায় ছয় সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে এবং পানির পরিমাণ গড়ের চেয়ে অনেক কম। এই বছর বিপরীতমুখী প্রবাহ পরিমাপ করা হয়েছে ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার, যেখানে গড় পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ঘনমিটার।
পানির অভাবে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম সংকটে পড়েছেন। চেম ওউর্ন নামের ৪০ বছর বয়সী এক জেলে জানান, আগে যেখানে দিনে ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাছ ধরে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ রিয়েল আয় করা যেত, এখন সেখানে ভালো মানের মাছই পাওয়া যায় না। চং খনেয়াস গ্রামের চাউম চ্রেব জানান, তার ছেলে ভোর ৪টা থেকে মাছ ধরেও মাত্র পাঁচটি মাছ পেয়েছে, যা জ্বালানির খরচও তুলতে পারেনি।
মৎস্যজীবীদের এই আর্থিক সংকট তাদের পরিবারগুলোতে গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং সন্তানরা পড়াশোনা ছেড়ে কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রিয়াং নাকরেই ও সর্ন চাভির মতো বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মৎস্য আহরণ এখন আর নির্ভরযোগ্য পেশা নয়। কম্বোডিয়া ডেভেলপমেন্ট রিসোর্স ইনস্টিটিউট এবং রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অফ নমপেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মাছের উৎপাদন ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমানে পৌ গ্রামের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পাঁচ মিটার উঁচু কাঠের খুঁটির ওপর তৈরি ঐতিহ্যবাহী ঘরগুলোর নিচে এখন শুধু শুকনো পলিমাটি দেখা যায়। বাঁশের ভেলা ও খালি তেলের ড্রামের ওপর তৈরি ভাসমান ঘরগুলো এখন নদীর তীরে শুকনো মাটিতে আটকে আছে। সোক রিনার মতো অনেক বয়স্ক মানুষের সন্তানরা জীবিকার সন্ধানে সিহানুকভিল বা নমপেনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। জলবায়ু ও পরিবেশের এই পরিবর্তন কেবল তাদের ঘরবাড়িকেই মাটিতে আটকে ফেলেনি, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
































