লন্ডনের ব্যস্ত ও জটিল সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল শুরু করেছে উবারের চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি। ব্রিটিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'ওয়েভ' (Wayve)-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তিতে চালিত ১৫টি 'ফোর্ড মাস্ট্যাং ম্যাক-ই' (Ford Mustang Mach-E) গাড়ি নিয়ে উবার এই নতুন সেবা চালু করেছে। তবে শহরের ট্রাফিক পরিস্থিতি এবং আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে প্রতিটি গাড়ির চালকের আসনে এখনও একজন মানব সুপারভাইজার উপস্থিত থাকছেন।
লন্ডনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখনও রাস্তায় সম্পূর্ণ চালকবিহীন গাড়ির অনুমোদন দেয়নি। ফলে উবারের এই রোবোট্যাক্সিগুলো লন্ডনের যেকোনো এলাকায় যাতায়াত করতে পারলেও আপাতত বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রী পরিবহন করতে পারছে না। শত বছরের পুরোনো সড়ক এবং অসংখ্য গোলচত্বর বা রাউন্ডঅ্যাবাউট সমৃদ্ধ লন্ডনে এই প্রযুক্তি চালু করাকে উবারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়েভ-এর কর্মকর্তা ক্যান্ডাল লন্ডনের ট্রাফিক ব্যবস্থার জটিলতা তুলে ধরে বলেন, সান ফ্রান্সিসকোর মতো শহরের তুলনায় লন্ডনে ১০ গুণেরও বেশি সাইকেল আরোহী ও পথচারী চলাচল করেন। এছাড়া এখানে রাস্তা মেরামতের কাজও প্রায় ১০ গুণ বেশি হয়। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এই ব্যস্ত শহরে গাড়ি চালানো অত্যন্ত কঠিন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের এই স্টার্টআপ ওয়েভ-এর পেছনে উবার ছাড়াও এনভিডিয়া (Nvidia) ও মাইক্রোসফট (Microsoft)-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গুগল-এর মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের আওতাধীন 'ওয়েমো' (Waymo) দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনের মানচিত্র তৈরির কাজ করলেও এখনও সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সেবা চালু করেনি। চলতি বছরের শুরুর দিকে '৬০ মিনিটস' (60 Minutes)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যান্ডাল ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ওয়েভের এআই প্রযুক্তি ওয়েমোর চেয়ে আলাদা, কারণ এটি গাড়ি চালানোর আগে পুরো শহরের মানচিত্র তৈরি করে না। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ঘণ্টার ড্রাইভিং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের এআই-কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যেকোনো সম্পূর্ণ নতুন বা অচেনা রাস্তায় এটি তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ৫০০টিরও বেশি শহরে ওয়েভ তাদের গাড়ি চালিয়ে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছে।
সিবিএস নিউজ (CBS News)-এর একটি দল সাধারণ উবার ভাড়ার চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি খরচ দিয়ে এই রোবোট্যাক্সি ব্যবহারের একটি বাস্তব পরীক্ষা চালায়। যাত্রার শুরুতে গাড়িটি চমৎকারভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চললেও পরবর্তীতে একটি সরু গলিপথে গিয়ে আটকে যায়। তখন গাড়িতে থাকা মানব সুপারভাইজারকে স্টিয়ারিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিতে হয় এবং গাড়িটি চালিয়ে বের করতে হয়।
যারা কোনো অপেশাদার চালক চান না, তাদের জন্য লন্ডনের বিখ্যাত ব্ল্যাক ক্যাব চালকরা রয়েছেন, যাদের শহর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সংখ্যা বেশ হ্রাস পেয়েছে। 'ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন'-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে শহরে ব্ল্যাক ক্যাব চালকের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার থাকলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজারে। এই রোবোট্যাক্সি সেবা ব্ল্যাক ক্যাব চালকদের জীবিকাকে ঝুঁকিতে ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উবারের স্বয়ংক্রিয় গতিশীলতা ও ডেলিভারি বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান সরফরাজ মারেডিয়া বলেন, নিকট ভবিষ্যতে তারা এমন কোনো ঝুঁকি দেখছেন না। বরং বাজার বড় হচ্ছে এবং চালকবিহীন গাড়ি এই বাড়তি চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
































