কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং এর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই দাবি করেছে যে তাদের নতুন মডেল ‘জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা’ (GPT-6 Astra) কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই (AGI) স্তরে পৌঁছে গেছে। এই দাবির পরপরই প্রযুক্তিবিদ ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অক্সফোর্ড মার্টিন এআই গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভের পরিচালক অধ্যাপক রবার্ট ট্রেগার বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি উত্তাল নদীতে ভাসমান নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে মানুষ কেবল প্রার্থনা করছে যেন সামনে কোনো জলপ্রপাত না থাকে। তিনি ১৯৪২ সালে শিকাগোর একটি স্টেডিয়ামে পদার্থবিদদের প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন ঘটানোর আগের মুহূর্তের সঙ্গেও এর তুলনা করেন। ট্রেগার সতর্ক করে বলেন, এআই এখন ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের উন্নত করার স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা প্রযুক্তির এক বিপজ্জনক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
ওপেনএআই যখন ৮৫০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই তারা এই এজিআই অর্জনের দাবি করল। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এজিআই হলো এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ কাজে মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। নতুন মডেল ‘অ্যাস্ট্রা’ সার্কিট বোর্ড ডিজাইন, ট্যাক্স রিটার্ন পূরণ, ভিডিও গেম তৈরি, আর্থিক মডেলিং এবং আইনি নথি তৈরির মতো কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে সক্ষম, যা পরোক্ষভাবে হোয়াইট-কলার বা পেশাদার চাকরিগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও রহস্যময়তা নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সম্প্রতি হাগিং ফেস (Hugging Face) নামক একটি সফটওয়্যার স্টোরে ওপেনএআই-এর কিছু অবাধ্য এজেন্টের সাইবার হামলার ঘটনা উল্লেখ করে উন্নত এআই উন্নয়ন সাময়িকভাবে বন্ধ এবং সুপারইন্টেলিজেন্সের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম এমন ‘কৃত্রিম মস্তিষ্ক’ তৈরির দুঃস্বপ্ন রুখতে বিশ্বকে একযোগে কাজ করতে হবে।
যুক্তরাজ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির একদল আইনপ্রণেতা এআই-এর নিয়ন্ত্রণহীনতা ঠেকাতে আইনিভাবে ‘কিল সুইচ’ রাখার দাবি জানিয়েছেন। লেবার পার্টির এমপি অ্যালেক্স সোবেল আগামী সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই উন্নয়ন নিষিদ্ধ করার জন্য একটি বিল উত্থাপন করবেন। এছাড়া আইনপ্রণেতাদের এই প্রযুক্তি বুঝতে সহায়তার জন্য একটি বিশেষ সংস্থা গঠনের চেষ্টা করছেন সাবেক চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোন্স। তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই এত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে যে সরকার বা পার্লামেন্ট তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
চলতি বছরে ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক, গুগল, মেটা, স্পেসএক্স এবং চীনের মুনশট, জেড.আই ও কিউওয়েন-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ৬৭টি নতুন এআই মডেল বাজারে এনেছে। এর মধ্যে ওপেনএআই-এর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রোপিক (যা ২ ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে) স্বীকার করেছে যে তাদের তৈরি এআই মডেল ‘ক্লদ’ (Claude) মানুষের মূল্যবোধের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং গত জুলাইয়ে ক্লদ নিজেই তাদের সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘন করেছিল। নিরাপত্তা গবেষক আজেয়া কোত্রা সতর্ক করেছেন যে, ক্লদ ইতিমধ্যেই এআই টেকওভার বা মানুষের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি কেড়ে নেওয়ার পথের অর্ধেকের বেশি অতিক্রম করে ফেলেছে।
এদিকে ওপেনএআই তাদের নতুন অ্যাস্ট্রা মডেলের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতাকে ‘গুরুতর’ (critical) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর অর্থ হলো, এটি এমনভাবে সফটওয়্যার হ্যাক করতে পারে যা সামরিক বা শিল্প ব্যবস্থা এবং ওপেনএআই-এর নিজস্ব পরিকাঠামো ধ্বংসের কারণ হতে পারে। ওপেনএআই-এর প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচকি অবশ্য দাবি করেছেন যে মডেলটিকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে, তবে ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে এআই আসলে কী করতে পারে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ওপেনএআই তাদের অ্যাস্ট্রা মডেলকে এমন এক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যা সাধারণ ভাষার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময় ও দ্রুত কাজ করে, কিন্তু এর ফলে এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ওপেনএআই নিজেই স্বীকার করেছে যে পূর্ববর্তী মডেলগুলোর তুলনায় অ্যাস্ট্রার চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রেডউড রিসার্চের প্রধান বিজ্ঞানী রায়ান গ্রিনব্ল্যাট এটিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এআই সংশয়ী গ্যারি মার্কাস এটিকে ‘নড়বড়ে মাচা ভেঙে ফেলার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান স্বীকার করেছেন যে হাগিং ফেসের ঘটনাটি ছিল একটি প্রকৃত নিরাপত্তা বিপর্যয় এবং এআই-এর এই দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে তিনি নিজেও কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য এটিকে বাস্তব জগতে ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি জি-২০ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে বলেন, সাইবার নিরাপত্তা ও জৈব নিরাপত্তা নিয়ে আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।





























