সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) ব্যবহার করে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। অনুমোদনহীন ভুয়া বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে এই অর্থ সরানো হতো। একটি তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২৬ জন পেনশনভোগীর নামে ৩৪৬টি বকেয়া বিল তৈরি করে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২ সেপ্টেম্বর দুই সরকারি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
জালিয়াতির এই অভিনব কৌশলে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ পাঠিয়ে একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে রেখে বাকি টাকা চক্রটির নির্ধারিত হিসাবে ফেরত নেওয়া হতো। বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আক্তার হোসেনের উদাহরণে দেখা যায়, চলতি বছরের জুনে তাঁর নিয়মিত ১৫ হাজার ৪০৬ টাকা পেনশনের পাশাপাশি ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি ১ লাখ টাকা কমিশন রেখে বাকি টাকা চক্রটির নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেন। এভাবে এক বছরের বেশি সময়ে পেনশনের বাইরে তিনি প্রায় ৭২ লাখ টাকা নিয়েছেন, যেখানে তাঁর প্রকৃত পাওনা ছিল উৎসব ভাতাসহ মাত্র ২ লাখ টাকার কিছু বেশি।
তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বা পেনশন আটকে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে এই সমঝোতা করা হতো। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধার বকেয়া ভাতা আসবে বলে সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। অতি সম্প্রতি এক পেনশনভোগী তাঁর আয়কর বিবরণী তৈরি করতে গিয়ে ব্যাংক হিসাবে এই অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি টের পান, যার সূত্র ধরে পুরো জালিয়াতি সামনে আসে। নথিপত্র অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্তদের মাসিক পেনশন ১১ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে হলেও তাঁদের হিসাবে প্রায় প্রতি মাসেই একাধিকবার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ টাকা করে পাঠানো হতো, যাতে দুই লাখ টাকার লেনদেন সীমা অতিক্রম না হয়। প্রথমে ২৩ পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। যদিও যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাতে কেবল গত দুই অর্থবছরের (২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ বা 2024-25 ও 2025-26) এ–সংক্রান্ত লেনদেন যাচাই করতে বলা হয়েছে।
আক্তার হোসেন ছাড়াও নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য জি এম সাজ্জাদ হোসেনের হিসাবে এক বছরের বেশি সময়ে ৩২টি লেনদেনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মো. হারুন অর রশিদ মৃধার হিসাবে আট মাসে ৪৪ লাখ, মো. শাহিনুর ইসলামের হিসাবে ছয় মাসে ৪০ লাখ, মো. শাহার আলীর হিসাবে তিন মাসে ১৬ লাখ, আমজাদ হোসেনের হিসাবে তিন মাসে ১২ লাখ এবং খন্দকার আবুল হোসাইনের হিসাবে এক মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। কেবল এই সাতজন পেনশনভোগীর হিসাব ব্যবহার করেই আড়াই কোটি টাকার বেশি অর্থ সরানো হয়েছে।
গ্রাহকদের কাছ থেকে কমিশন রেখে বাকি অর্থ আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ফেরত নেওয়া হতো। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার আদর্শ স্টেশনারির হিসাবে গত মার্চ ও এপ্রিলে খুলনা ও রাজশাহী শাখা থেকে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে, যার মালিক জি এম সাজ্জাদ হোসেন এবং অর্থ জমা দিয়েছেন এম শাহিন। এছাড়া আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে আদনান এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ১০ লাখের বেশি এবং তামান্না এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ৩ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়, যেখানে জমাদানকারী হিসেবে এম শাহিনের নাম রয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভুলবশত অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হলে তা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। এই নিয়মের সুযোগ নিয়ে চক্রটি ভুয়া ট্রেজারি চালান জমা দিয়ে অর্থ সমন্বয়ের চেষ্টা করত। তদন্তে দেখা গেছে, শাহিনুর ইসলামের নামে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ টাকার একটি চালানের অনলাইন যাচাইয়ে দেখা যায় সেটি আসলে ইকবাল হাসান রবিন নামের অন্য এক ব্যক্তির মাত্র ৮ হাজার ৫০ টাকার চালান। একইভাবে শাহিনুরের আরেকটি ৮ লাখ টাকার চালানে অর্চনা রানী দত্তের ৪৯৪ টাকার চালান ব্যবহার করা হয়েছে। সাজ্জাদ হোসেনের ১৬ লাখ টাকার চালানের জায়গায় শাহ আলম কবিরের ৩ হাজার কোটি টাকার চালান এবং আক্তার হোসেনের ১২ লাখ টাকার চালানের বিপরীতে মিরাজ উদ্দিনের ১২,১২২ টাকার আসল চালান ব্যবহার করে জালিয়াতি করা হয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের (সিজিডিএফ) অধীন চিফ কন্ট্রোলার অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স (পেনশন অ্যান্ড ফান্ড) বা সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তের আদেশে বলা হয়েছে, তাঁদের ইউজার আইডি ব্যবহার করেই ২৬ জন পেনশনভোগীর ৩৪৬টি বকেয়া বিলের সার্টিফিকেট ও ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও বরখাস্তের আগে শাহীনুর রহমান খান দাবি করেছিলেন যে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। অন্য কর্মকর্তা ইশরাত জাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জালিয়াতির এই ঘটনা খতিয়ে দেখতে গত ১৭ আগস্ট তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার আহ্বায়ক এ কে এম হাছিবুর রহমান, সদস্যসচিব মো. মফিজুর রহমান এবং সদস্য মোছা. বিউটি খাতুন। কমিটি সিসিডিএফ কার্যালয়ের ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ (2024-25 ও 2025-26) অর্থবছরের পেনশন বিবরণী, পরিশোধিত বকেয়া বিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইবাস প্লাস প্লাসের ইউজার আইডিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়েছে। তবে সদস্যসচিব মফিজুর রহমান ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত ওই কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন, যা তদন্তের আওতাধীন সময়ের অংশ হওয়ায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে মফিজুর রহমান জানান, কারিগরি বিষয়ে অভিজ্ঞতার কারণেই কর্তৃপক্ষ হয়তো তাঁকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। এদিকে সিসিডিএফ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের পর থেকে পেনশন কার্যক্রমের কোনো নিয়মিত অডিট না হওয়ায় এই জালিয়াতি সহজে ধরা পড়েনি।
মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জালিয়াতির ঘটনা জানার পরপরই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, অতীতেও এমন জালিয়াতি ধরা পড়ায় মামলা ও বরখাস্তের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে আইবাসের মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরানোর আরেকটি ঘটনা ঘটেছে বগুড়ায়, যেখানে sechs পুলিশ সদস্যের নামে ১৯৫টি ভুয়া বিল তৈরি করে ১ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮২৬ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া সিআইডি ভুয়া পেনশন বিলের মাধ্যমে তিনটি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার টাকা স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু সরকারি অনুসন্ধানেই জালিয়াতিটি চিহ্নিত হয়েছে, তাই এটিকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। একের পর এক এমন ঘটনা সামনে আসায় এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এই ধরনের সব ঘটনার আপাদমস্তক তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।


























