ড. নরম্যান সোয়ান তাঁর নতুন বই 'দ্য ব্রেইন ক্লিফ'-এ মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার বৈজ্ঞানিক দিক এবং জ্ঞানীয় অবক্ষয় প্রতিরোধের কার্যকর উপায়গুলো বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, মস্তিষ্কের অবক্ষয় নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে একে ভিন্নভাবে দেখা বা একে 'পরিবর্তন' হিসেবে বিবেচনা করলে চিন্তাভাবনা ও স্মৃতিশক্তি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সোয়ান তিনটি মূল ধারণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথমত, আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে ২০ বছর বয়সের সাথে তুলনা করা একটি ভুল ধারণা, যা অপ্রয়োজনীয় হতাশা তৈরি করে। মাঝবয়সে (৪০ ও ৫০ বছর বয়সে) মস্তিষ্ক ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, বরং পরিবর্তিত হয়। এই সময়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বা ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্সের চেয়ে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বা ক্রিস্টালাইজড ইন্টেলিজেন্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, মস্তিষ্ক বয়সের সাথে সাথে 'স্ক্যাফোল্ডিং' বা স্নায়বিক জালের অবকাঠামো তৈরি করে, যা জ্ঞানীয় ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেয়। তৃতীয়ত, এই স্নায়বিক জালের বিকাশকে উৎসাহিত করতে হবে এবং এর পথে বাধা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সোয়ান সাতজন 'কগনিটিভ সুপার-এজার'-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যাদের বয়স ৯৪ থেকে ১০০ বছর। তাদের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া গেছে যে, তারা মানসিক চাপ সামলাতে দক্ষ এবং অহেতুক দুশ্চিন্তা বা রিউমিনেশন থেকে দূরে থাকেন। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিষণ্নতা ও অতিরিক্ত মদ্যপানও এই এলাকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৪০ ও ৫০ বছর বয়স হলো মস্তিষ্ককে মানিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সোয়ান জানিয়েছেন, শরীরচর্চা মস্তিষ্কের নমনীয়তা বা প্লাস্টিসিটি বাড়ায়। এছাড়া অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট—যেমন শাকসবজি, দই, এবং বেরি জাতীয় ফল মস্তিষ্কের মাইক্রোবায়োম ও স্নায়বিক কাঠামো গঠনে সহায়তা করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, 'মাইন্ড ওয়ান্ডারিং' বা অলস সময়ে মনকে ঘুরতে দেওয়া মস্তিষ্কের জন্য ভালো, কারণ এতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একে অপরের সাথে নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত ইতিহাসের চেয়ে পরিবেশ ও জীবনধারা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। ড. সোয়ান নিজে তাঁর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে মদ্যপান কমিয়ে দিয়েছেন, নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন এবং শাকসবজি ও দইকে খাদ্যতালিকায় প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে অবসর গ্রহণ মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। তাঁর মতে, অবসর মানেই যদি অলস বসে থাকা হয়, তবে তা মস্তিষ্কের অবক্ষয়কে দ্রুততর করে। এর পরিবর্তে স্বেচ্ছাসেবী কাজ, নতুন দক্ষতা অর্জন বা শখের কাজে যুক্ত থাকাকে তিনি 'কাজ' হিসেবেই গণ্য করতে পরামর্শ দিয়েছেন।

























