ইসলামি পরিভাষায় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো ‘ফরজে আইন’, যা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে শেখা বাধ্যতামূলক। আর দ্বিতীয়টি হলো ‘কিফায়াহ’ বা সমষ্টিগত ফরজ, যা সমাজের বা এলাকার যেকোনো একজন শিখলে অন্যদের ওপর থেকে সেই বাধ্যবাধকতা নেমে যায়। প্রখ্যাত আলেম ইবনে আব্দিল বার তাঁর ‘জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি’ গ্রন্থে এই বিভাজনের কথা উল্লেখ করেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক বা ফরজে আইন জ্ঞান সম্পর্কে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.)। তাঁর মতে, এমন কিছু জ্ঞান রয়েছে যা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। এই আবশ্যকীয় ধর্মীয় জ্ঞান মূলত চার ভাগে বিভক্ত।
প্রথম প্রকারটি হলো ইমানের মৌলিক পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান। আল্লাহ তাআলা, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ এবং শেষ দিবস তথা কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এর অন্তর্ভুক্ত। এই বিষয়গুলোর ওপর বিশ্বাস ছাড়া কেউ মুমিন হতে পারে না। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াত এবং সুরা নিসার ১৩৬ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া সহিহ মুসলিমের ৮ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে, ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) যখন নবীজি (সা.)-কে ইমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি এই পাঁচটি বিষয়ের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।
দ্বিতীয় প্রকারের মধ্যে রয়েছে ইসলামি শরিয়তের বিধানাবলির জ্ঞান। বিশেষ করে একজন বান্দার নিজের প্রাত্যহিক আমল যেমন—অজু, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা এবং এগুলোর আনুষঙ্গিক বিষয়, শর্ত ও তা ভঙ্গের কারণগুলো জানা এর অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় প্রকারটি হলো পাঁচটি চিরন্তন হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়ের জ্ঞান। এই বিষয়গুলো পূর্ববর্তী রাসুলদের শরিয়তেও নিষিদ্ধ ছিল। সুরা আরাফের ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এগুলো হলো—প্রকাশ্য বা গোপন অশ্লীল কাজ, সব ধরনের পাপ, অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করা যার কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করা হয়নি এবং আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কোনো কথা বলা। এই বিষয়গুলো সব অবস্থায় এবং সবার জন্য সম্পূর্ণ হারাম। কিছু বিষয় সাময়িকভাবে হালাল হতে পারে (যেমন চরম বিপদে মৃত জীব বা শূকরের মাংস খাওয়া), তবে এই পাঁচটি বিষয় কখনোই কারও জন্য হালাল করা হয়নি। এ জন্যই আয়াতে সীমাবদ্ধতা বোঝাতে ‘ইননামা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
চতুর্থ প্রকারটি হলো সামাজিক মেলামেশা ও পারস্পরিক লেনদেন বা মুআমালাত-মুআশারাতের বিধান-সম্পর্কিত জ্ঞান। মানুষের অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদাভেদে এই জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে। যেমন একজন শাসকের প্রজার প্রতি দায়িত্ব আর সাধারণ মানুষের প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব এক নয়। একইভাবে, যিনি ব্যবসায় নিয়োজিত, তাঁর জন্য বেচাকেনার নিয়মকানুন শেখা যতটুকু ফরজ, সাধারণ একজন মানুষের জন্য ততটুকু ফরজ নয়।
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম তাঁর ‘মিফতাহু দারিস সাআ’দাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই আবশ্যকীয় জ্ঞানের মূল ভিত্তি তিনটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো—বিশ্বাসগত জ্ঞান (যা সত্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে), কর্মগত জ্ঞান (যা শরিয়তের হালাল সীমা অতিক্রম করবে না) এবং বর্জনগত জ্ঞান (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পাপ থেকে বিরত থাকা)। টঙ্গীর বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের শিক্ষক মাহমুদ হাসান ফাহিম এই ধর্মীয় বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন।
(ইবনে আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি, ১/৫৭, দারু ইবনিল জাওযি, সৌদি আরব, ১৯৯৪)ফরজে আইনের পরিচয়ফরজে আইনমূলক জ্ঞান সম্পর্কে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.)।
(ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ, মিফতাহু দারিস সাআ’দাহ ওয়া মানশুরি বিলায়াতুল ইলমি ওয়াল ইরাদাহ, ১/১৬১-১৬২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী.নামাজের ১৩টি ফরজ



























