গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের পশ্চিমে তীব্র বাতাসের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার সময় দুটি অগ্নিনির্বাপক হেলিকপ্টারের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (২ আগস্ট) এথেন্সের পশ্চিমে পসাথা এলাকায় বেল (Bell) মডেলের দুটি হেলিকপ্টার এই দুর্ঘটনার শিকার হয়, যার ফলে একটি বিমান মাটিতে ভেঙে পড়ে। প্রতিটি হেলিকপ্টারেই দুজন করে ক্রু সদস্য ছিলেন।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় দুই ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন গ্রিক এবং অন্যজন ডেনমার্কের নাগরিক। অপর দুই ক্রুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যাদের একজন গ্রিক এবং অন্যজন ব্রিটিশ নাগরিক। তবে নিহতরা একই হেলিকপ্টারে ছিলেন কি না বা জীবিতদের বর্তমান অবস্থা কেমন, সে সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি। এই দুর্ঘটনাটি ইউরোপের চলমান দাবানল সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি আবারও সামনে এনেছে।
তীব্র বাতাসের কারণে এথেন্সের দিকে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলে নতুন করে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত শুক্রবার আজিওস ভাসিলিওসের কাছে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা পোর্তো জার্মেনো এবং এথেন্সের পশ্চিমের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সড়কপথগুলো ধোঁয়া ও আগুনে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একমাত্র বিকল্প হিসেবে সমুদ্রপথে শুক্রবার ২৫৪ জন এবং শনিবার ১২ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বর্তমানে প্রায় ৫০০ অগ্নিনির্বাপক কর্মী এবং ২৩টি বিমান নিয়োজিত রয়েছে। তবে ঝড়ো বাতাসের কারণে শুকনো বনের মধ্য দিয়ে আগুন দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং তীব্র বাতাসের কারণে বিমানগুলো সমুদ্র থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারছে না। এথেন্সের পশ্চিমাঞ্চলীয় অ্যাটিকা অঞ্চলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় জনবসতি ও একটি শিল্প এলাকা হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি ২০১৮ সালের মাতি দাবানলের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, যাতে ১০৪ জন মারা গিয়েছিলেন।
ধোঁয়ায় পাহাড় ঢেকে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ কান্দিলি, আগিয়া স্কেপি এবং তুতুলি এলাকা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে করিন্থ উপসাগরের উপকূলীয় এলাকা পোর্তো জার্মেনো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিসকে এই উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
গ্রিসের অন্যান্য অঞ্চলেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আইওনিয়ান দ্বীপ কেফালনিয়ায় ঘরবাড়ি রক্ষায় বিমান থেকে পানি ফেলা হচ্ছে এবং বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া হালকিডিকির নেয়া তেনেদোস এলাকায় আরেকটি আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে। এর আগে চলতি সপ্তাহে ক্রিট দ্বীপে দাবানল নেভানোর সময় দুই অগ্নিনির্বাপক কর্মী এবং পেলোপোনিসে আরও একজন মারা যান।
স্থানীয় এক কৃষক মিনাস জর্দানিস শনিবার তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, "একটি আদিম বন, যা ছিল স্বর্গের মতো, তা আগুনের গ্রাসে চলে গেল। যা ঘটেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ধ্বংস, কেবলই সম্পূর্ণ ধ্বংস।"
কেবল গ্রিসেই নয়, ফ্রান্স ও স্পেনেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষকে বাড়িঘর ও পর্যটন কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার মতে, গত চার দশকে ইউরোপজুড়ে দাবানলে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ ৩,৮৬০ বর্গমাইল এলাকা পুড়ে যাওয়ার পর ২০২৬ সালেও এই সংকট অব্যাহত রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে ইউরোপ বিশ্বের অন্য যেকোনো মহাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফ্রান্সে দাবানল সৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা অন্তত দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।





























