ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাঁর প্রতিটি বিতর্কিত পদক্ষেপ—তা সে ভোটার জালিয়াতি নিয়ে ভুয়া বক্তব্য দেওয়া হোক কিংবা মধ্যবর্তী নির্বাচনে কারচুপির উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়া—সবকিছুই স্বৈরতান্ত্রিক শাসন সুসংহত করার চেষ্টা নাকি তাঁর চরম হতাশার বহিঃপ্রকাশ, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়ান-ভের্নার মুলার মনে করেন, ট্রাম্পের এই চরম দুঃসাহসিক পদক্ষেপগুলোই তাঁর শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি করছে।
একবিংশ শতাব্দীর একনায়কেরা আগের মতো সরাসরি সহিংসতা বা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ এড়িয়ে চলেন। তাঁরা দেশে-বিদেশে এমন একটি আবহ তৈরি করতে চান যেন মনে হয় সেখানে এখনো গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বজায় রয়েছে। হাঙ্গেরির সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ছিলেন এই কৌশলের ওস্তাদ। তিনি ইউরোপীয় কমিশন এবং জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে বোঝাতে বছরের পর বছর তথাকথিত 'ময়ূর নৃত্য' প্রদর্শন করেছিলেন যে তিনি কোনো চোরতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র কায়েম করছেন না।
সমাজবিজ্ঞানী সের্গেই গুরিয়েভ এবং ড্যানিয়েল ট্রেইসম্যান একনায়কতন্ত্রকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—'ভয়ের একনায়কতন্ত্র' এবং 'স্পিন একনায়কতন্ত্র'। তাঁদের মতে, ২০ শতকের তুলনায় বর্তমান যুগের স্বৈরতন্ত্রে সহিংসতার ব্যবহার অনেক কম। তবে সহিংসতা সবসময়ই বিকল্প হিসেবে জমা থাকে, যেমনটি ২০২২ সালে ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচন করে দেখিয়েছেন।
ট্রাম্পের কাজের ধরন অবশ্য অরবান বা পুতিনের চেয়ে আলাদা। নিউইয়র্কের আবাসন ব্যবসায়ী থাকাকালীন সময় থেকেই ট্রাম্পের কৌশল ছিল প্রকাশ্যে বেআইনি কিছু করা এবং পরে তা আদালতের বাইরে মীমাংসা করে নেওয়া বা প্রতিপক্ষকে তা মেনে নিতে বাধ্য করা। বর্তমানে তাঁর পুরো প্রশাসনই এই দায়মুক্তির আশায় বেআইনি কর্মকাণ্ডের পথ বেছে নিয়েছে। বছরে একটি কেলেঙ্কারি রাজনৈতিক মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, কিন্তু দিনে ১০টি কেলেঙ্কারি ঘটলে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলে। ট্রাম্প শিবিরের এই 'কেলেঙ্কারির বন্যা' ছড়ানোর কৌশল একদিকে যেমন ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে, অন্যদিকে বড় দুর্বলতাও তৈরি করে। যেকোনো একটি কেলেঙ্কারি—যেমন গ্রাফ্ট ও অদক্ষতার মিশ্রণে তৈরি 'রিফ্লেক্টিং পুল বিপর্যয়'—পুরো সরকারের দুর্নীতির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। হাঙ্গেরিতে যেমন অরবানের এক সহযোগীর শিশু নির্যাতন ধামাচাপা দেওয়া ব্যক্তিকে ক্ষমা করার ঘটনাটি তাঁর পুরো শাসনের পতনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
যেকোনো উদীয়মান একনায়ককে আনুগত্য ও যোগ্যতার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হয়। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে আনুগত্যই শেষ কথা। তাঁর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন এবং প্রকাশ্যে নির্বাচনের ফল অস্বীকার করার শপথ নেওয়াটাই ক্ষমতার ভিত্তি। কিন্তু চরম অযোগ্য ব্যক্তিরা যখন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, তখন তাঁদের ব্যর্থতাও একসময় সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এছাড়া ট্রাম্পের অনুসারীরা অরবানের মতো সুসংগঠিত উপায়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বা 'মাফিয়া রাষ্ট্র' গড়ে তুলতে পারেননি। বরং যে যেভাবে পারছেন দ্রুত লুটে নিচ্ছেন। এই পদ্ধতিগত দুর্বলতাই প্রমাণ করে যে ট্রাম্পপন্থীরা নিজেরাও বিশ্বাস করেন না যে তাঁদের এই শাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার মাইক জনসনও রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে একটি 'সুরক্ষা কর্মসূচি' হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা চলতি বছরই হাতছাড়া হতে পারে। স্বৈরতান্ত্রিক চোরতন্ত্রের আত্মবিশ্বাসী নির্মাতারা সাধারণত এত বোকার মতো কথা বলেন না। তবে এই রাজনৈতিক দুর্বলতা নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সান্ত্বনা নয়।


























