দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার শুরু থেকেই ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা দিলেও গত বুধবারের ওই মতবিনিময়ের আয়োজন সেই প্রচেষ্টাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল ও কূটনৈতিক একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার দিল্লির অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে ভারত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে ঢাকার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের যোগাযোগ হয়। তাঁদের আলাপচারিতায় দিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতবিনিময় নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ জানানো হয়। জবাবে ভারতীয় পক্ষ আশ্বস্ত করেছিল, অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করা হবে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও সীমিত থাকবে; শুধু আয়োজক সংগঠনের সদস্যরাই অংশ নেবেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেনি।
এ ছাড়া গত ৩০ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই মতবিনিময়ের আয়োজন দেখা গেল। গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার মতবিনিময় অনুষ্ঠানের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। দুই নিকট-প্রতিবেশীর সম্পর্কের এমন উত্তেজনা আর টানাপোড়েনের রেশ রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি জনপরিসরেও ছড়িয়েছে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার ভারত বলেছে, শেখ হাসিনার বক্তব্য তারা সমর্থন করে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘ওই মঞ্চ থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত (ডিউলি কনস্টিটিউটেড) সরকারের বিরুদ্ধে, তা ভারত সরকার অনুমোদন করে না।’
দিল্লির ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠান নিয়ে বুধবার রাতেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশ বলেছে, ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ।’ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের ব্যাপারে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। এরপরেও ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এমন একটি দিন যখন বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্যাপন করছে, সে সময় ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।
একসময়ের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ শেখ হাসিনা ভারতের জন্য ‘অস্বস্তির বোঝা’ হয়ে গেছেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক যে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারছে না, তার একটা বড় কারণ শেখ হাসিনা নিজেই। তিনি ভারত সরকারের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেওয়ায় দিল্লির বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বড় পরিসরকে বিবেচনায় নিয়ে ভারতের কোনো কোনো গণমাধ্যমও দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের সমালোচনা করেছে। দেশটির ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শেখ হাসিনা-নির্ভর হওয়া উচিত নয়’ শিরোনামে গতকাল একটি সম্পাদকীয় ছেপেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘যদিও ভারতে শেখ হাসিনা নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন, সেই আশ্রয়কে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত করা সমস্যাজনক।’
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘ভারত চাইলে এই সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে পারত। তাই বাংলাদেশ সম্ভবত এ ঘটনাকে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র শেখ হাসিনাকে আরেকবার প্রশ্রয় দেওয়ার উদাহরণ হিসেবেই দেখবে। এই সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় না, এই ব্যাখ্যা ঢাকার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।’
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক আসামি। দেশে তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দুই বছর ধরে দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা দিয়ে আসছেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ই-মেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। এই প্রথম দিল্লির কোনো অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, এমন একসময়ে এ ঘটনা ঘটেছে, যখন প্রায় দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারত ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। তবে শ্রীরাধা দত্ত এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা হিসেবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে।
আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ওই অনুষ্ঠানে তিনি যাবেন কি না, তা নিয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ঢাকার কূটনীতিকেরা বলছেন, গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় ব্রিকসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণকে আরও বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ঢাকাকে অসন্তুষ্ট করে তুলেছে।




























