মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের প্রাণকেন্দ্রে বুধবার ভোরে এক বিজয় সমাবেশে ৪১ বছর বয়সী আব্দুল এল-সায়েদ নিজেকে বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলীর সাথে তুলনা করে ঘোষণা করেন, "আমরা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছি।" জনস্বাস্থ্য বিষয়ক এই প্রাক্তন কর্মকর্তা ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রথাগত নেতৃত্বকে হারিয়ে মিশিগানের সেনেট নির্বাচনে দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। তিনি মার্কিন কংগ্রেসম্যান হ্যালি স্টিভেনসকে পরাজিত করেন।
এল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারণার মূল ভিত্তি ছিল সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ এবং নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কারের মতো প্রগতিশীল এজেন্ডা। অন্যদিকে, মধ্যপন্থী স্টিভেনস নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী থেকে ৬ কোটি ডলারের তহবিল পেয়েছিলেন, যার মধ্যে ৩ কোটি ডলার এসেছিল আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো থেকে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট ডাস এই ফলাফলকে বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি জনবিক্ষোভ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, "এটি কেবল আমাদের দেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভোটাররা এমন অভিজাত নেতৃত্বের ওপর বিরক্ত যারা তাদের কষ্টের কথা বোঝে না। আব্দুল এল-সায়েদের জয় সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন।"
২০১৬ সালে বার্নি স্যান্ডার্সের প্রচারণা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রগতিশীল বামপন্থার যে পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছিল, তা আজ আরও বিস্তৃত। আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং জোহরান মামদানির মতো নেতাদের উত্থান সেই ধারারই অংশ। মামদানি গত নভেম্বরে নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
গাজা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাজনীতিতে কর্পোরেট অর্থের প্রভাব ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। রয়টার্স/ইপসোস-এর তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্রেটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ২০১৮ সালের ৫৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালের মে মাসে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। মিশিগানে আরব-আমেরিকানদের বড় অংশের উপস্থিতি এবং এল-সায়েদের ইসরায়েল বিরোধী অবস্থান তার বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটার পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্নেন্স সেন্টারের পরিচালক ল্যারি জ্যাকবসের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতি ডেমোক্রেটিক পার্টিকে এক অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, "ট্রাম্প পার্টিকে আমূল পরিবর্তনের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, যা দলের নেতৃত্ব ও নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।"
তবে প্রগতিশীলদের এই উত্থান সহজ হবে না বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। ডানপন্থী কর্পোরেট ডেমোক্র্যাটরা তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন। নরমান সলোমন মনে করেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যারা দল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, তারা সহজে মাঠ ছাড়বে না। এদিকে, রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং স্পিকার মাইক জনসন বামপন্থীদের 'উগ্র মার্ক্সবাদী' হিসেবে আখ্যায়িত করে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র করছেন।
আগামী নভেম্বরে এল-সায়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন, যা সেনেটে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল দুই অংশই এখন নির্বাচনের মাঠে টিকে থাকার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ডেমোক্রেটিক পার্টির আদর্শিক লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।





























