কাতার এবং ওমান সালতানাতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক গভীর ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং জনগণের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার এই সম্পর্ককে সময়ের সাথে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করে তুলেছে।
দুই দেশের আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে। ১৯৭৩ সালে ওমান সালতানাতে কাতারের প্রথম রাষ্ট্রদূত নিয়োগের জন্য আমিরি ডিক্রি জারি করা হয় এবং পরের বছর ১৯৭৪ সালে দোহায় ওমানের প্রথম রাষ্ট্রদূত তার পরিচয়পত্র পেশ করেন। এই আনুষ্ঠানিকতার পেছনে ছিল ভৌগোলিক নৈকট্য এবং শতবর্ষের সামাজিক ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য ধারা।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সফর বিনিময় এই সম্পর্ককে সুদূরপ্রসারী ভিত্তি দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৩ সালের অক্টোবরে আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির মাস্কাট সফর, ২০২১ সালের নভেম্বরে সুলতান হাইথাম বিন তারিকের ঐতিহাসিক দোহা সফর এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আমিরের পুনরায় ওমান সফর। এসব উচ্চপর্যায়ের সফরের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কাতার ও ওমান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় একযোগে কাজ করছে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ আরব ও ইসলামিক সংকটে দুই দেশের অবস্থান সবসময়ই অভিন্ন ও সুনির্দিষ্ট। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উভয় দেশই মধ্যপন্থী ও দায়িত্বশীল কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৯৫ সালে গঠিত হয় ‘কাতার-ওমান যৌথ কমিটি’। ১৯৯৫ সালের এপ্রিলে দোহায় এর প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এর ২৩তম অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে। এই কমিটি কৃষি, জ্বালানি, পরিবহন, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৩ সালের শেষে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১১৩ বিলিয়ন ওমানি রিয়াল, যা ২০২৪ সালের নভেম্বর শেষে ৯৫১ মিলিয়ন ওমানি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ওমানে কাতারি বিনিয়োগ ২০২২ সালের ৬৫২ মিলিয়ন রিয়াল থেকে ১২ শতাংশ বেড়ে ২০২৩ সালের শেষে ৭৩০ মিলিয়ন রিয়ালে পৌঁছেছে। বর্তমানে প্রায় ১৫টি বৃহৎ কাতারি প্রতিষ্ঠান ওমানের শিল্প, সেবা ও আবাসন খাতে সক্রিয় রয়েছে।
এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা ‘কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০’ এবং ‘ওমান ভিশন ২০৪০’-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং লজিস্টিকস খাতে দুই দেশ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশ ‘জিসিসি সাংস্কৃতিক কৌশল ২০২০-২০৩০’ অনুসরণ করে শিল্প, সঙ্গীত ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের দোহা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ওমান সালতানাতকে ‘গেস্ট অফ অনার’ হিসেবে সম্মানিত করা হয়, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক নৈকট্যের গভীরতাকে তুলে ধরে।
পরিশেষে, কাতার ও ওমানের এই অংশীদারিত্ব প্রজ্ঞা ও যৌথ স্বার্থের এক অনন্য উদাহরণ। শীর্ষ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা ও জনগণের সমর্থনে এই সম্পর্ক আগামী দিনে পুরো জিসিসি অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির নতুন বার্তা নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১৯৭৪ সাল: দোহায় কাতারের কাছে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করেন ওমানের প্রথম রাষ্ট্রদূত।
১৯৮১ সালে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কাতার ও ওমান এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এক হয়ে কাজ করছে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য: ২০২৩ সাল শেষে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১১৩ বিলিয়ন ওমানি রিয়াল (প্রায় ২.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
আঞ্চলিক যেকোনো সংকট নিরসনে দোহা ও মাস্কাট সর্বদা মধ্যস্থতা, সংলাপ এবং বিচক্ষণ কূটনৈতিক নীতিতে বিশ্বাসী।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি: ওমানে কাতারি বিনিয়োগ ২০২৩ সালের শেষের দিকে ১২% বৃদ্ধি পেয়ে ৭৩০ মিলিয়ন ওমানি রিয়ালে পৌঁছেছে (যেটি ২০২২ সালে ছিল ৬৫২ মিলিয়ন রিয়াল)।
অন্যদিকে, কাতারের বাজারে শত শত ওমানি প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সূত্র: গালফ বাংলা




























