দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষায় উচ্চ পাসের হার বজায় থাকার পর টানা দুই বছর ধরে ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা বিগত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। পাসের হারের পাশাপাশি এবার সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ১৯ হাজার কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন, যা গত বছর ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারও শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দুর্বলতা সামগ্রিক ফলাফলে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কুমিল্লা ছাড়া বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ ও গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজির ফল খারাপ হয়েছে; এবার সেখানে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করার কারণেই মূলত পাসের হার কমেছে। দুটি বিষয়ই বাধ্যতামূলক হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সরাসরি সার্বিক ফলাফলে পড়েছে।
এবারের পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের পাসের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে; এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি এবং ছাত্র প্রায় ৪৭ হাজারের বেশি। বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড।
গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে পর্যন্ত চলা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অংশ নিয়েছিল ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী—যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি—উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমে যাওয়ায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এবার ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যেখানে গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ৪৮টি।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে মানবিক বিভাগের ফল সবচেয়ে দুর্বল। মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ লাখের বেশি হলেও পাসের হার বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার তুলনায় অনেক কম। মানবিকে ছাত্রদের পাসের হার প্রায় ৪১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ শতাংশের বেশি এবং ছাত্রীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফলও মানবিকের চেয়ে ভালো হয়েছে। ফলে মানবিক বিভাগের এই দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমিয়ে দেওয়ার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
গত সোমবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার এই ফল প্রকাশ করা হয়। একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি ভোকেশনাল ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এবারের ফলাফলকে খারাপ বলতে রাজি নন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এবারের ফল সুন্দর হয়েছে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি মন্তব্য করেন, মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়া যায় না। একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে যে শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, নির্মোহভাবে সেভাবেই মূল্যায়ন হয়েছে।
মাধ্যমিকের গত তিন দশকের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) পদ্ধতি চালুর পর ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ছিল ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে। এরপর প্রশ্নব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ২০০৭ সাল পর্যন্ত পাসের হার আবার কিছুটা কমে যায়। ২০০৮ সাল থেকে পাসের হার পুনরায় বাড়তে শুরু করে এবং সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালুর পর তা দীর্ঘ সময় ৮০ শতাংশের ওপরে বা কাছাকাছি ছিল। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পরও ৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং ইংরেজি-গণিতে বড় দুর্বলতা থাকা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। বিদ্যালয়ের শিখন মান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি নিয়ে নতুন করে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
































