মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় একটি নাটকীয় নিরাপত্তা অভিযানের খবর সামনে এসেছে। গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিশ্বাসযোগ্য হুমকির মুখে পড়েন তিনি। এই হুমকি এড়াতে ট্রাম্পকে অত্যন্ত গোপনে একটি বিকল্প বিমানে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তাঁর ব্যবহৃত মূল বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ ৭৪৭-কে ডিকয় বা ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি ট্রাম্পকে বিমানে আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় একটি সাধারণ ক্যাটারিং ট্রাক।
সিক্রেট সার্ভিসের এই অত্যন্ত গোপন অভিযানটি প্রকাশ পেতে প্রায় এক মাস সময় লেগেছে। আঙ্কারা থেকে উড্ডয়নের সময় ট্রাম্পের বিকল্প বিমানের জানালাগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, গণমাধ্যমকর্মী ও হোয়াইট হাউসের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে আসল এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটি যথারীতি রওনা দেয়। একজন ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে এবং ইরানের সামরিক দুর্বলতার দাবিকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই সম্ভবত এই অভিযানের বিষয়টি এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল। অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা আফগানিস্তান, ইরাক বা ইউক্রেনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে গোপনে ভ্রমণ করলেও, গণমাধ্যমের অগোচরে এভাবে ক্যাটারিং ট্রাকে লুকিয়ে থাকার ঘটনা নজিরবিহীন।
এই ঘটনাটি ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন অনুমোদন ও সমন্বয়ে পরিচালিত এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতারা নিহত হন। এর পরদিনই ট্রাম্প এবিসি নিউজের সংবাদদাতা জোনাথন কার্লকে ফোনে বলেছিলেন, "ও আমাকে মারার আগেই আমি ওকে শেষ করেছি। ওরা দুবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমিই প্রথম সফল হয়েছি।" ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত লড়াইয়ের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কণ্ঠেও। গত মার্চে তিনি বলেছিলেন, "ইরান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ট্রাম্পই শেষ হাসি হেসেছেন।"
ট্রাম্পের প্রতি ইরানের এই ক্ষোভ নতুন নয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) প্রধান কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই তেহরান প্রতিশোধের অঙ্গীকার করে আসছে। এমনকি ফ্লোরিডায় ট্রাম্প যখন গলফ খেলছিলেন, তখন ড্রোনের মাধ্যমে তাঁকে নিশানা করার একটি ইরানি দেয়ালচিত্রও প্রকাশ করা হয়েছিল। কেবল প্রচারণাই নয়, বাস্তবেও ট্রাম্পকে হত্যার একাধিক চেষ্টা চালানো হয়েছে। ২০২২ সালে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে হত্যার ইরানি চক্রান্ত নস্যাৎ করে বাইডেন প্রশাসন। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আসিফ মার্চেন্ট নামে এক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়, যার সঙ্গে আইআরজিসির যোগাযোগ ছিল। ২০২৬ সালের মার্চে মার্চেন্ট দোষী সাব্যস্ত হন। এছাড়া ফরহাদ শাকেরি নামে এক আফগান নাগরিকের বিরুদ্ধেও ট্রাম্পকে হত্যার চক্রান্তের অভিযোগ আনা হয়েছে, যিনি এখনো পলাতক।
২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে এক নির্বাচনী সভায় ট্রাম্পের ওপর গুলিবর্ষণ এবং ফ্লোরিডার গলফ কোর্সে এক সশস্ত্র ব্যক্তির গ্রেপ্তারের ঘটনা ট্রাম্পের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা ম্যাগি হ্যাবারম্যানের মতে, "ট্রাম্পের কাছে ইরান এবং এই সার্বক্ষণিক হুমকির অনুভূতি একটি বড় ঝাপসা স্মৃতির মতো হয়ে গেছে।" সংবাদমাধ্যম সেমাফোর জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রায়শই কৌতুকের ছলে তাঁর জীবননাশের আশঙ্কার কথা বলেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্প ঠাট্টা করে বলেন, "প্রেসিডেন্ট হওয়া যে এত বিপজ্জনক, তা আগে কেউ আমাকে বলেনি। বললে হয়তো আমি নির্বাচনেই দাঁড়াতাম না।"
২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে ট্রাম্পের বোমাবর্ষণ এবং চলতি বছরের ব্যাপক বিমান হামলা ও নৌ-অবরোধের পর ইরানের পক্ষ থেকে নতুন করে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে সরাসরি সতর্ক করে লিখেছিলেন যে, ইরান তাঁর ওপর হামলা চালালে দেশটির দিকে ১,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র তাক করা রয়েছে। খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা "#KillTrump" লেখা ব্যানার বহন করে এবং তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ট্রাম্পের কফিনের ছবিসহ "রক্তের বদলে রক্ত" লেখা দেয়ালচিত্র প্রদর্শন করা হয়। তুরস্ক থেকে ফেরার পথে বিমানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন, "আমি সবসময়ই পড়েছি যে ওদের তালিকায় আমি এক নম্বরে আছি।"




























