প্রায় ৯০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে গবেষক, জীবনীকার এবং উৎসাহীদের তাড়া করে ফিরছে একটিই প্রশ্ন—কোথায় হারিয়ে গেলেন কিংবদন্তি নারী বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট? বহু বছর ধরে সমুদ্রের তলদেশ স্ক্যান করা, প্রত্যন্ত দ্বীপে অনুসন্ধান চালানো এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করার পর, অবশেষে এই রহস্যের জট খোলার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী অক্টোবরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রত্যন্ত দ্বীপে নতুন করে একটি অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে।
এই অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৭৮ বছর বয়সী প্রত্নতাত্ত্বিক রিচার্ড পেটিগ্রু। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, "আমি এই অভিযান নিয়ে খুবই আশাবাদী এবং রোমাঞ্চিত।" মূলত 'তারাইয়া অবজেক্ট' (Taraia object) নামের একটি ভিজ্যুয়াল অসঙ্গতিকে কেন্দ্র করে এই অনুসন্ধান চালানো হবে। ২০২০ সালে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে নিকুমারোরো দ্বীপের লেগুনে (হ্রদ) এই বস্তুটি শনাক্ত করা হয়। পারডিউ রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং আর্কিওলজিক্যাল লেগাসি ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে এই অভিযানটি পরিচালিত হবে।
আবহাওয়াগত জটিলতা এবং দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণকারী দেশ কিরিবাতি সরকারের অনুমতির অপেক্ষায় থাকায় মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবরের এই মিশনটি এক বছর পিছিয়ে যায়। তবে সম্প্রতি কিরিবাতি সরকারের ক্যাবিনেটের কাছ থেকে নতুন অনুমোদন পাওয়ার পর, আগামী অক্টোবরে ১৬ সদস্যের একটি দল সমুদ্রপথে নিকুমারোরো দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।
১৯৩৭ সালের ২১ মে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড থেকে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট এবং তাঁর নেভিগেটর ফ্রেড নুনান। বিশ্বভ্রমণের প্রায় শেষ পর্যায়ে, ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই পাপুয়া নিউ গিনির লায় থেকে হাউল্যান্ড দ্বীপের উদ্দেশ্যে ওড়ার সময় তারা নিখোঁজ হন। হাউল্যান্ড দ্বীপে মার্কিন কোস্ট গার্ডের জাহাজ 'ইটাস্কা' তাদের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অপেক্ষা করছিল। কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা ইয়ারহার্টের কাছ থেকে কিছু ভয়েস মেসেজ পেয়েছিলেন, যেখানে তিনি জানিয়েছিলেন যে তাঁর বিমানের জ্বালানি প্রায় শেষ। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের সরকারি নথির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইয়ারহার্ট বা নুনান কেউই মোর্স কোড জানতেন না, ফলে দ্বিমুখী কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার পর মার্কিন সরকার বিমান অনুসন্ধানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর কোনো হদিস না পেয়ে অনুসন্ধান শেষ করা হয় এবং ১৯৩৯ সালের ৫ জানুয়ারি তাঁদের আইনগতভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে কোটি কোটি ডলার খরচ করে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত দ্বীপগুলোতে বহু অভিযান চালানো হয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালেও একটি গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানকারী দল হাউল্যান্ড দ্বীপের ১০০ মাইলের মধ্যে ইয়ারহার্টের 'ইলেক্ট্রা ১০ই' (Electra 10E) বিমানের ধ্বংসাবশেষের মতো একটি কাঠামো খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিল, যা পরে কেবল একটি পাথরের স্তর বলে প্রমাণিত হয়।
ইয়ারহার্টের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে নানা তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন এটি কোনো গোপন গুপ্তচর মিশন ছিল, কেউ ভাবেন তিনি নতুন পরিচয় নিয়ে বেঁচে ছিলেন, আবার কারও মতে তাঁরা জাপানিদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো, জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের বিমানটি হাউল্যান্ড দ্বীপের কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরে ভেঙে পড়ে। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এভিয়েশন কিউরেটর ডরোথি কোচরান এই তত্ত্বটিকে সমর্থন করে বলেন, "নথি অনুযায়ী আমি বিশ্বাস করি যে তাঁরা হাউল্যান্ড দ্বীপের খুব কাছাকাছি ছিলেন।"
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি তত্ত্ব জোরালো হয়েছে যে, ইয়ারহার্ট এবং নুনান নিকুমারোরো দ্বীপে অবতরণ করেছিলেন এবং সেখানেই মারা যান। এই তত্ত্বের প্রধান ভিত্তি হলো ২০১৫ সালের এপ্রিলে স্যাটেলাইট ইমেজে ধরা পড়া নিকুমারোরো দ্বীপের লেগুনে থাকা একটি অজানা বস্তু, যা ইয়ারহার্টের নিখোঁজ হওয়ার পরবর্তী মাস ও বছরগুলোতে তোলা ছবির অসঙ্গতির সাথে মিলে যায়। এছাড়া এই দ্বীপ থেকে উদ্ধার হওয়া ১৯৩০-এর দশকের কিছু নিদর্শন যেমন নারীর জুতো, মেছতা দূর করার ক্রিমের কৌটা, ওষুধের শিশি এবং মানুষের হাড়ের অবশিষ্টাংশ (যা ইয়ারহার্টের শারীরিক গঠনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ) এই তত্ত্বকে সমর্থন করে।
তা সত্ত্বেও, কোচরানসহ অনেক গবেষকই এখনো সন্দিহান। ইয়ারহার্টের জীবন নিয়ে বই লেখা এবং সাংবাদিক হিসেবে নিকুমারোরো দ্বীপে দুবার ভ্রমণ করা লেখিকা রাচেল হার্টিগান বলেন, "তারা যদি সত্যিই কিছু খুঁজে পান তবে তা হবে অসাধারণ। কিন্তু অতীতেও এমন অনেক আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।"
আগামী অক্টোবরে কয়েক দিনব্যাপী এই অভিযানে গবেষকরা সমুদ্রপথে নিকুমারোরো দ্বীপে পৌঁছাবেন। এরপর তারা হাইড্রোলিক ড্রেজ ব্যবহার করে লেগুনের পলি সরিয়ে পরীক্ষা করবেন যে এটি আসলেই সেই বিখ্যাত 'ইলেক্ট্রা ১০ই' বিমান কি না। গবেষক দলটি বিমানের ফিউজেলেজ (মূল বডি) এবং ডানার মতো বড় অংশগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করবে। পেটিগ্রু জোর দিয়ে বলেন, "এটি কেবল একটি হাইপোথিসিস বা অনুমান। আমরা সেখানে গিয়ে শনাক্ত না করা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারছি না।"
পেটিগ্রু আরও জানান, যদি সত্যিই বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, তবে আগামী বছর পূর্ণাঙ্গ খনন ও উদ্ধারের জন্য তারা আবার ফিরে আসবেন। পারডিউ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভ শুল্টজ জানান, উদ্ধারকৃত ধ্বংসাবশেষের হেফাজত পাওয়ার বিষয়ে তারা কিরিবাতি সরকারের সাথে আলোচনা করছেন। উল্লেখ্য, ইয়ারহার্ট একসময় পারডিউ ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং অ্যাডভাইজার ছিলেন এবং ঐতিহাসিক এই ফ্লাইট শেষে বিমানটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শুল্টজ এবং পেটিগ্রু দুজনেই মনে করেন, এই অভিযানে কিছু না পাওয়া গেলেও তা ব্যর্থতা হবে না। পেটিগ্রুর ভাষায়, "সেখানে কিছু একটা আছে। হয় এটি ইলেক্ট্রা বিমান, না হয় অন্য কিছু। কাউকে না কাউকে তো এটি নিশ্চিত করতে হবে—আর আমরাই সেই কাজটি করতে যাচ্ছি।"





























