কাজাখস্তানের সরকারি ই-গভর্নমেন্ট (eGov) পোর্টাল থেকে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির দাবি করেছে এক হ্যাকার। এই গুরুতর অভিযোগের পর দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।
কাজাখস্তানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল উন্নয়ন মন্ত্রণালয় এই তথ্য ফাঁসের রিপোর্টের কথা স্বীকার করে জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ই-গভর্নমেন্ট তথ্য ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বা সংশ্লিষ্ট ডেটাবেসটি সরাসরি ই-গভ (eGov) থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ই-গভ প্ল্যাটফর্মের কাঠামোর সঙ্গে হ্যাকারের দাবির কিছু অমিল বা অসঙ্গতি রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বজুড়ে আধুনিক জীবনের একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ডেটা বা তথ্য ফাঁস। কাজাখস্তান সরকারও অন্যান্য দেশের মতো তাদের নাগরিক সেবাগুলোকে ডিজিটাল করার ওপর জোর দিয়েছে। একদিকে কাগজের নথিপত্র এবং সশরীরে অফিসে যাওয়ার ঝামেলা দূর হওয়ায় নাগরিক সেবা দ্রুত মিলছে, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ছোটখাটো দুর্নীতি দূর করতে সাহায্য করে। তবে অন্যদিকে, এই ই-গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে জটিল করছে এবং অপরাধ ও দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম সেকিউরিক্সওয়াই (SecuriXy.kz) জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া ফাইলের রেকর্ডগুলোর বেশিরভাগই ২০২২ সালের হলেও, এতে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, তথ্য ফাঁসের এই ঘটনাটি সাম্প্রতিক এবং এটি নাগরিকদের জন্য একটি বাস্তব হুমকি তৈরি করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে ফিশিং, জাল নথি তৈরি, ই-গভ ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে হামলা এবং ফোনে প্রতারণার মতো অপরাধের ঘটনা ঘটতে পারে।
জানা গেছে, একটি হ্যাকার ফোরামে "রেসিডেন্টস অব কাজাখস্তান ২০২৪" (Residents of Kazakhstan 2024) শিরোনামে ফাইলটি বিনামূল্যে ডাউনলোডের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আরএফই/আরএল (RFE/RL) তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই তথ্য ফাঁসের পেছনে তিনটি সম্ভাব্য উৎস থাকতে পারে। এগুলো হলো—অর্ধ-উন্মুক্ত সরকারি সেবার এপিআই (API), দুর্বল কনফিগারেশনের প্ল্যাটফর্ম হ্যাকিং অথবা ইন্টিগ্রেশন সিস্টেম থেকে অননুমোদিত উপায়ে ডেটা ডাউনলোড।
কাজাখস্তানের ডিজিটাল উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং মহাকাশ শিল্প মন্ত্রণালয় (যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল উন্নয়ন মন্ত্রণালয় হিসেবে পুনর্নামকরণ করা হয়) দ্রুত এই ঘটনার তদন্তের ঘোষণা দেয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে কাজাখ সরকারি কর্মকর্তারা এই ধরনের তথ্য ফাঁসের গুরুত্বকে কিছুটা হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় ‘আস্তানা টাইমস’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, তদন্তে সরকারি তথ্য ব্যবস্থায় কোনো অনুপ্রবেশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ডেটাবেসটিতে ২০২২ সালের পুরোনো তথ্য ছিল, যা আগের কোনো তথ্য ফাঁসের ঘটনা থেকে এসেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে সিস্টেমে প্রবেশাধিকার থাকা ব্যবহারকারীরা এতে আংশিক নতুন তথ্য যুক্ত করেছিলেন।
এরই মধ্যে, ২০২৫ সালের জুন মাসে কাজাখ কর্তৃপক্ষ টেলিগ্রামের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ১৪০ জনেরও বেশি মানুষের একটি চক্রকে আটক করেছিল।
বর্তমানে কাজাখস্তান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে। দেশটির রাজধানী আস্তানা ২০২৬ সালকে "ডিজিটালাইজেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্ষ" হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ২০২৫ সালের শেষের দিকে মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে একটি ব্যাপক এআই আইন পাস করেছে। চলতি বছরের জুনে কাজাখস্তান একিবাস্টুজে 'ডেটা সেন্টার ভ্যালি' প্রতিষ্ঠার জন্য ফায়ারবার্ড এবং এনভিডিয়ার (Nvidia) সাথে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর আগে মে মাসে, রাষ্ট্রপতির একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটিকে (KNB) নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে এই নিরাপত্তা সংস্থাটি সরাসরি এআই অবকাঠামো নির্মাণের অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
































