চিনের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলা অমানবিক নির্যাতনের এক প্রত্যক্ষদর্শী বয়ান উঠে এসেছে কালবিনুর সিদ্দিকের লেখা স্মৃতিকথা 'হার্ট ফুল অফ লাইট'-এ। তিনি নিজে একজন শিক্ষক ছিলেন এবং চিনের ওই বন্দিশালাগুলোর ভেতরে কাজ করার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। কালবিনুর জানিয়েছেন, বন্দিশালার ভেতরের সেই করুণ দৃশ্য আজও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
২০১৬ সাল থেকে চিনের জিনজিয়াংয়ে উইঘুর সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া আরও তীব্র হয়। কালবিনুর সিদ্দিক জানান, সেই সময় দশ লক্ষেরও বেশি উইঘুরকে 'পুনঃশিক্ষা'র নামে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে নারীদের ওপর চালানো হতো জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ। এছাড়া উইঘুর শিশুদের বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হতো এবং প্রায় দশ লক্ষ হান ক্যাডারকে উইঘুর পরিবারগুলোর সাথে থাকতে বাধ্য করা হতো। কালবিনুরের স্বামীর বসের পক্ষ থেকে তাদের বাড়িতে থাকার সময় তার অশালীন আচরণ জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল।
২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কালবিনুরকে একটি গোপন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন, বন্দিশালার চারপাশ কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা। সেখানে একশটি ছোট টুল দিয়ে সাজানো একটি কক্ষে বন্দিদের আনা হতো, যাদের হাত ও পা শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল। তাদের মাথা ন্যাড়া করা ছিল এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। প্রতিদিন তাদের খাবার হিসেবে দেওয়া হতো মাত্র একটি ভাপানো রুটি ও পাতলা জাউ।
বন্দিশালায় বন্দিদের ওপর নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, ডিএনএ সংগ্রহ এবং আইরিস স্ক্যান করা হতো। কালবিনুরের বর্ণনায়, বন্দিদের ওপর চলা প্রতিটি নির্যাতনের আর্তনাদ আজও তিনি শুনতে পান। সেখানে নারীদের ওপর চালানো হতো অকথ্য নির্যাতন। তিনি নিজেও একবার চরম হতাশায় ভুগেছিলেন, এমনকি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু নিজের মেয়ের কথা ভেবে তিনি বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন।
২০১৯ সালে চিকিৎসার অজুহাতে চিন থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান কালবিনুর। নেদারল্যান্ডসে গিয়ে তিনি আশ্রয় নেন এবং নিজের অভিজ্ঞতার কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, 'চুপ থাকা আমার কাছে কোনো বিকল্প নয়।' যদিও এই সত্য বলার জন্য তাঁকে চিনা সরকারের হুমকি ও নিজের আত্মীয়দের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি তাঁর স্বামীকে দিয়ে চিনা সরকার ভিডিও রেকর্ড করিয়ে তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে প্রচার করেছে।
কালবিনুর সিদ্দিকের মতে, বন্দিশালায় তাঁর ছাত্রদের মুখগুলো তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। তিনি মনে করেন, ঈশ্বর তাঁকে এই সত্য তুলে ধরার জন্য বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর স্মৃতিকথাটি কেবল নির্যাতনের দলিল নয়, এটি একইসাথে মানুষের মর্যাদা ও প্রতিরোধের এক সাহসী বয়ান।






























