আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ ও আইনগত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুই দশক আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কাদিম বসতিটি আবারও চালু করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের বর্তমান কট্টরপন্থী সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতির ওপর ভর করে গত বৃহস্পতিবার তেল আবিব থেকে ৩০টি "অগ্রগামী পরিবার" এই বসতিতে এসে পৌঁছেছে। জেনিন শহরের উপকণ্ঠে একটি ছোট পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই বসতিটি ২০০৫ সালে তৎকালীন ইসরায়েল সরকার উচ্ছেদ করেছিল। ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা এই এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের নতুন এই তৎপরতাকে চরম আতঙ্কের সঙ্গে দেখছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমস্ত ইসরায়েলি বসতি এবং আউটপোস্ট অবৈধ।
এই বসতিটি পুনরায় চালুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তিনি একে একটি ঐতিহাসিক সংশোধন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "উত্তর সামারিয়া (পশ্চিম তীরের বাইবেলীয় নাম) থেকে বিতাড়নের অপরাধের ২১ বছর পর আমরা সেই ভুল সংশোধন সম্পন্ন করেছি এবং কাদিমে ফিরে এসেছি।" অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রী, নেসেটের (পার্লামেন্ট) স্পিকার আমির ওহানা এবং আঞ্চলিক বসতি স্থাপনকারী কাউন্সিলের প্রধান ইয়োসি দাগান। দাগান প্রতিজ্ঞা করেন যে, একদিন বসতি স্থাপনকারীরা গাজাতেও ফিরে যাবে।
২০০৫ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন সরকার একটি একতরফা প্রত্যাহার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাদিমসহ উত্তর পশ্চিম তীরের চারটি বসতি খালি করে দিয়েছিল এবং গাজা থেকে সমস্ত সৈন্য ও বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নিয়েছিল। সে সময় এই বসতিগুলোকে অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন, সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এবং কৌশলগতভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হতো। তবে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার জেনিন এলাকার চারপাশের বসতি স্থাপনের ওপর থাকা ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করার পর কাদিমই সর্বশেষ বসতি হিসেবে পুনরায় চালু হলো। এর আগে গানিম, সানুর এবং হোমেশ বসতিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে।
কাদিমে বসতি স্থাপনকারীদের এই ফিরে আসাকে চরম আতঙ্কের সঙ্গে দেখছেন স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা। পাহাড়ের পেছনের একটি মাটির রাস্তার পাশে বসবাসকারী ৫৩ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি সবজি চাষী জানান, তিনি ছোটবেলায় এই কাদিম বসতি গড়ে উঠতে দেখেছেন এবং ২০ বছর আগে তাদের উচ্ছেদ হতেও দেখেছেন। তিনি বলেন, "তখন আমরা পাশাপাশি শান্তিতেই থাকতাম। কিন্তু এখন তাদের ফিরে আসা আমাদের আতঙ্কিত করছে।" তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি বাহিনী ইতিমধ্যে মহাসড়কের পাশের দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং তাঁর ভাইপোদের লেবু ও সবজি বাগান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বলেছে, "এখানে তোমাদের কোনো জায়গা নেই, আর কখনো আসবে না।" ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় হাইফা থেকে পালিয়ে আসা এই কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, "আমার মধ্যে আর বাস্তুচ্যুত হওয়ার মতো শক্তি নেই। আমরা এখন চরম ভীতি ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।"
২০২২ সালের শেষের দিকে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার পুরো পশ্চিম তীরজুড়ে ১০০টিরও বেশি নতুন বসতির অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে ১৯টিই উত্তর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। পিস নাও (Peace Now) সংগঠনের 'সেটেলমেন্ট ওয়াচ' কর্মসূচির পরিচালক হাগিত অফরান জানান, আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের আগেই পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের জন্য সরকার এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এরই অংশ হিসেবে জেনিনের পশ্চিমে 'এমেক দোতান' নামক আরেকটি নতুন বসতি গত রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে প্রায় দুই ডজন ইহুদি পরিবার বসবাস শুরু করেছে।
এমেক দোতানের পাশে বসবাসকারী আংশিক দৃষ্টিহীন এবং পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি স্কুলশিক্ষক সামের জাবের জানান, বসতি স্থাপনকারীরা আসার পর থেকেই তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, "তারা আমাদের বাড়ির সামনে এসে আমাদের ও আমাদের সন্তানদের ভিডিও করে। আমার স্ত্রী বাইরে বের হলেই তারা ছবি তোলে। এমনকি গভীর রাতে তারা আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে শক্তিশালী ফ্লাডলাইট মারে এবং ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে।" তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "ইউরোপের আমাদের জন্য সময় নেই, আমেরিকা ইরানকে নিয়ে ব্যস্ত, আর জাতিসংঘের কার্যকারিতা শেষ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও আধুনিক সভ্যতা আসলে একটি মিথ্যা।"
নতুন বসতি স্থাপনের পাশাপাশি জেনিন এলাকায় দুটি নতুন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিও দ্রুত গড়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া, ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর এই প্রথম ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা জেনিন শরণার্থী শিবিরের পাশে জাবরিয়াত নামক স্থানে একটি সামরিক আউটপোস্ট তৈরি করছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, "কার্যক্রমগত প্রয়োজনেই" এই আউটপোস্ট তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালে জেনিন শরণার্থী শিবির দখল করার আগে সেখান থেকে হাজার হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে দিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। জেনিনের ফিলিস্তিনি গভর্নর কামাল আবু আল-রুব আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ফিলিস্তিনি শহরের কেন্দ্রস্থলে এভাবে জমি দখল করে ইসরায়েল আসলে জেনিনকে হেবরন বা জেরুজালেমের মতো বিভক্ত করার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, "গত দুই দশক আমরা শান্তিতে ছিলাম, কিন্তু এখন আমরা তাদের হামলা ও অত্যাচারের নরকে বাস করছি।" কয়েক সপ্তাহ আগেও যে সড়ক দিয়ে কাদিমে যাতায়াত করা যেত, সেখানকার একটি ক্যাফে এবং ডজনখানেক ফিলিস্তিনি দোকানপাট এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বুলডোজারের আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।






























