ইংলিশ চ্যানেলে রাশিয়ার একটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরের তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনায় নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে সমর্থন করেছে যুক্তরাজ্য। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই ঘটনার পর ‘একইভাবে জবাব দেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার তাদের এই প্রতিক্রিয়া জানাল।
গত জুনে এক নজিরবিহীন অভিযানে রয়্যাল মেরিন কমান্ডোরা ‘এমটি স্মিরটোস’ (MT Smyrtos) নামের এই জাহাজটি ইংলিশ চ্যানেলে আটকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে জাহাজটি দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ওয়েমাউথ বন্দরের কাছে আটক রয়েছে এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। জাহাজটির ক্যাপ্টেন অজয় পান্তের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নিষিদ্ধ রুশ তেল সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরবরাহ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরে রুশ নৌবাহিনীর মহড়া তদারকি করার সময় পশ্চিমা দেশগুলোর এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন পুতিন। তিনি একে ‘দস্যুতা ও দস্যুবৃত্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়, তবে আমাদেরও একইভাবে জবাব দিতে হবে। আর এই জবাব যে কেবল আমাদের জাহাজে হানা দেওয়ার পরিকল্পনাস্থলেই দেওয়া হবে তা নয়, বরং আমরা যেখানে প্রয়োজন ও উপযুক্ত মনে করব, সেখানেই তা করব।”
পুতিনের এই মন্তব্যের জবাবে যুক্তরাজ্যের সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ মেনে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা স্মিরটোস জাহাজে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্য শ্যাডো ফ্লিটের ক্ষতিকর সামুদ্রিক কার্যক্রম প্রতিরোধ ও ব্যাহত করছে, যা ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধকে উসকে দিচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, রাশিয়ার ছায়া বহরের মতো নয়, বরং যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলে।
রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের কমান্ডার ভিক্টর লিনা উল্টো ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিজস্ব ‘শ্যাডো ফ্লিট’ পরিচালনার অভিযোগ এনেছেন। তিনি দাবি করেন, বন্ধুভাবাপন্ন নয় এমন রাষ্ট্রগুলোর জাহাজ ও তাদের ছায়া বহর পরিদর্শন ও আটকে রাখার ক্ষমতা রাশিয়ার রয়েছে এবং এ বিষয়ে তাদের আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা প্রস্তুত রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার ৭০০-র বেশি জাহাজের একটি বিশাল ছায়া বহর রয়েছে, যা দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ তেল পরিবহন করে থাকে। ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘অবৈধ যুদ্ধ’ সচল রাখতে এই তেল ক্রেমলিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইফলাইন। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, জটিল মালিকানা কাঠামো এবং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে এই জাহাজগুলো তাদের কার্গোর উৎস গোপন করে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আড়াল করে থাকে।
এদিকে, রাশিয়ার এই ছায়া বহরের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) চাপ বৃদ্ধি করছে। ২০২৪ সাল থেকে ইইউ এই ধরনের একক জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা শুরু করেছে, যাকে ইউরোপীয় কাউন্সিল ‘পুতিনের ডার্ক ফ্লিট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ২০২৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৬৩০টিরও বেশি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এগুলো ইইউর বন্দরে প্রবেশ করতে পারছে না। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইইউর চারপাশে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার সন্দেহে ৯টি শ্যাডো ফ্লিট ট্যাঙ্কার জব্দ করা হয়েছে।
আটককৃত স্মিরটোস জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রুদের রসদ সরবরাহের দায়িত্ব এর মালিকের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। তবে গত জুলাই মাসে মূল ২৫ জন ক্রুর মধ্যে ২২ জনকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি ইতালীয় নৌবাহিনীও মধ্য ভূমধ্যসাগরে সন্দেহভাজন একটি ট্যাঙ্কারে তল্লাশি চালিয়েছে, যা এই অভিযানেরই অংশ।





























