চিলি থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত, ২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণগুলো শতাব্দীর সেরা মহাজাগতিক দৃশ্য উপহার দিতে প্রস্তুত। ১২ আগস্ট ২০২৬-এর পূর্ণ সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর, আকাশ পর্যবেক্ষকদের পরবর্তী বড় ঘটনার জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। পরবর্তী সূর্যগ্রহণটি ঘটবে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সালে, যা এখন থেকে ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে। এটি একটি বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ হবে, যা দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে ‘রিং অব ফায়ার’ বা আগুনের বলয় তৈরি করবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দাদের জন্য ২ আগস্ট ২০২৭ তারিখটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এদিন দেশটিতে সূর্যগ্রহণের একটি আংশিক দৃশ্য দেখা যাবে। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণটি একটি বলয়গ্রাস গ্রহণ। যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে আসে কিন্তু সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না, তখন এই ঘটনা ঘটে। এর ফলে অন্ধকার হওয়ার পরিবর্তে, পর্যবেক্ষকরা সূর্যের চারপাশে একটি উজ্জ্বল বলয় দেখতে পান, যা ‘রিং অব ফায়ার’ নামে পরিচিত। এই বলয়গ্রাস গ্রহণের পথটি দক্ষিণ চিলি এবং আর্জেন্টিনার কিছু অংশ দিয়ে যাবে, তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এটি দেখা যাবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ২ আগস্ট ২০২৭ তারিখটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫ অক্টোবর ২০২২ সালের আংশিক সূর্যগ্রহণের পর এটিই হবে দেশটিতে দৃশ্যমান প্রথম সূর্যগ্রহণ। দুবাই অ্যাস্ট্রোনমি গ্রুপের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দুবাইয়ে সূর্যের প্রায় ৫৩ শতাংশ অংশ ঢাকা পড়বে এবং পুরো আমিরাত জুড়ে এই হার ৫০ থেকে ৫৭ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এর মানে হলো, ওই দিন দুপুরের দিকে বাসিন্দারা সূর্যের একটি বড় অংশ চাঁদের আড়ালে ঢাকা পড়তে দেখবেন।
২ আগস্ট ২০২৭ সালের সূর্যগ্রহণটি বিশ্বজুড়ে এত বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করছে কেন? কারণ বিশ্বের অন্যান্য স্থানে এটি শতাব্দীর অন্যতম নাটকীয় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই গ্রহণের পূর্ণতার পথটি দক্ষিণ স্পেন ও জিব্রাল্টার হয়ে মরক্কো, আলজেরিয়া ও সৌদি আরবের ওপর দিয়ে যাবে। গ্রহণের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পূর্ণতা স্থায়ী হবে প্রায় ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড, যা একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘ সময়।
উত্তর আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপের পরিষ্কার আগস্টের আকাশ এই অঞ্চলকে পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ করে তুলবে। দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণতা, সহজগম্য অবস্থান এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে একটি বিশেষ আকর্ষণ। সৌদি আরবের কিছু অংশ এই পূর্ণতার পথের ভেতরে থাকবে, যার ফলে সেখানে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে। এটি হবে ৭৫ বছরের মধ্যে সৌদি আরবের প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ভৌগোলিকভাবে সৌদি আরবের কাছাকাছি হলেও, দেশটি পূর্ণতার পথের বাইরে থাকায় সেখানে কেবল আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সর্বশেষ আংশিক সূর্যগ্রহণ হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ২০২২ সালে, যখন সূর্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ ডিস্ক ঢাকা পড়েছিল। এর আগে ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে আমিরাতে একটি বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত বিরল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ কবে দেখা যাবে? জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, দেশটিতে পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ৩ সেপ্টেম্বর ২০৮১ সালে। তবে তার আগে বাসিন্দারা বেশ কিছু আংশিক সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে ২ আগস্ট ২০২৭ এবং ১ জুন ২০৩০ সালের আংশিক গ্রহণগুলো উল্লেখযোগ্য।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ কেন একটি নির্দিষ্ট স্থানের জন্য এত বিরল? পূর্ণ সূর্যগ্রহণ তখনই ঘটে যখন চাঁদের ছায়ার সবচেয়ে অন্ধকার অংশ বা ‘আমব্রা’ পৃথিবীর ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। এই ছায়া সাধারণত মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি সরু পথ তৈরি করে। এই পথের বাইরে থাকলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হয় না। এই কারণেই সৌদি আরব বা মিশরের মানুষ ২০২৭ সালে পূর্ণ গ্রহণ দেখলেও আমিরাতের বাসিন্দারা তা দেখতে পাবেন না।
পৃথিবীর যেকোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানের জন্য দুটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের মধ্যবর্তী সময় কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত হতে পারে। তবে মহাকাশ গবেষণায় ২০২৭ সালের এই ঘটনাটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি মহাজাগতিক ঘটনা নয়, বরং শতাব্দীর অন্যতম সেরা দৃশ্য হিসেবে স্বীকৃত।
ভবিষ্যতের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সূর্যগ্রহণের মধ্যে রয়েছে ২০২৮ সালের ২২ জুলাই অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে দৃশ্যমান পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। এছাড়া ২৫ নভেম্বর ২০৩০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়, ২০ মার্চ ২০৩৪ সালে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় এবং ২ সেপ্টেম্বর ২০৩৫ সালে চীন ও কোরিয়া উপদ্বীপে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
অস্ট্রেলিয়া এক্ষেত্রে বেশ ভাগ্যবান, কারণ ২০২৮ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে বেশ কয়েকটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেশটির ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। আকাশ পর্যবেক্ষকদের জন্য আগামী কয়েক দশক মহাজাগতিক বিস্ময়ে ভরপুর থাকবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দারা ২০২৭ সালের আগস্টের এই আংশিক সূর্যগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। দুবাই অ্যাস্ট্রোনমি গ্রুপ এবং অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থাগুলো এই বিরল দৃশ্যটি নিরাপদে দেখার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নির্দেশিকা প্রচারের পরিকল্পনা করছে।
সূত্র: গালফ নিউজ






























