জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ পরিবারের সদস্যের কাছে টাকা পাঠাতে গিয়ে তিন দিন অপেক্ষা করার কথা কল্পনা করুন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ষাটের দশকে প্রবাসীদের জন্য এটিই ছিল বাস্তবতা, যখন আল আনসারি এক্সচেঞ্জ প্রথম তাদের কার্যক্রম শুরু করে। অথচ আজকের দিনে সেই একই অর্থ স্থানান্তর মাত্র তিন সেকেন্ডে সম্পন্ন হয়।
আল আনসারি ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের গ্রুপ সিইও রাশেদ এ. আল আনসারি সেই শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, “আমার মনে আছে, তখন অনেক সময় লাগত। টাকা পৌঁছাতে তিন দিন লেগে যেত। কিন্তু এখন এটি তাৎক্ষণিক। গ্রাহক শাখা থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার হাতল ধরার আগেই টাকা সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায়।”
গত পাঁচ দশকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেমিট্যান্স খাত অভাবনীয় গতি পেয়েছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স বহির্গামী বাজার, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রবাসী। তারা নিয়মিত তাদের পরিবারের সহায়তায় নিজ দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে থাকেন।
আর্থিক পরিষেবার এই বিবর্তন কেবল রেমিট্যান্সেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আগে পরিবারগুলো যখন অন্য দেশে ভ্রমণ করত, তখন তাদের প্রচুর নগদ অর্থ সাথে বহন করতে হতো। এখন ট্রাভেল কার্ডের মাধ্যমে হাজার হাজার দিরহাম লোড করে কেনাকাটা ও ভ্রমণ করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এটিএম থেকে নগদ টাকাও তোলা সম্ভব। রাশেদ আল আনসারি বলেন, “ভ্রমণের সময় বৈদেশিক মুদ্রা বহন করাটা এখন কতটা সহজ হয়েছে, তা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”
প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে কঠোর হয়েছে কমপ্লায়েন্স বা নিয়মকানুন। রাশেদ জানান, আজকের দিনে গতির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো কমপ্লায়েন্স। সন্দেহভাজন নাম বা অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করার জন্য প্রেরক ও প্রাপকের ওপর রিয়েল-টাইম যাচাইকরণ করতে হয়। অনেক সময় আংশিক মিল থাকলে ম্যানুয়াল পর্যালোচনার প্রয়োজন পড়ে। এই সমস্যা সমাধানে কোম্পানি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করছে, যা মুহূর্তের মধ্যে জন্ম তারিখের মতো তথ্য যাচাই করে ভুল অ্যালার্মগুলো দূর করতে সক্ষম।
আল আনসারির এই যাত্রার শুরু ১৯৬৬ সালে। প্রতিষ্ঠাতা মূলত খাদ্যদ্রব্য ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তেল উত্তোলনের ফলে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক আসার পর তিনি অর্থ স্থানান্তরের সুযোগটি কাজে লাগান। সংযুক্ত আরব আমিরাত গঠনের পাঁচ বছর আগেই তিনি আবুধাবির কেন্দ্রীয় বাজারে প্রথম শাখা খোলেন।
রাশেদ আল আনসারি জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই ব্যবসার মধ্যে বড় হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আল আহমাদিয়া এলিমেন্টারি স্কুলে পড়তাম এবং আমার বাবার একটি শাখা কাছাকাছি ছিল। স্কুল শেষে বাবা আমাকে দোকানে ডেকে নিতেন এবং পরে একসাথে বাড়ি ফিরতাম।” সেই সময় বাবার গ্রাহকদের সাথে লেনদেন ও ফোন কলের উত্তর দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার মূল্যবোধগুলো শিখেছেন।
ছয় দশক পর সেই ছোট শাখাটি এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৃহত্তম এক্সচেঞ্জ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাদের ২৮০টিরও বেশি শাখা রয়েছে এবং শীঘ্রই তা ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে। রাশেদ বলেন, “আমরা কোনো সংখ্যার পেছনে ছুটছি না। গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতেই আমরা প্রতি কয়েক মাস অন্তর নতুন শাখা খুলছি।”
গ্রুপটি বাহরাইন, কুয়েত ও ভারতেও তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। সম্প্রতি তারা ২০০ মিলিয়ন ডলারে বাহরাইনের বিএফসি গ্রুপ অধিগ্রহণ করেছে এবং ওমানে প্রবেশের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১৮ সালে আল আনসারি এক্সচেঞ্জ যখন তাদের অ্যাপ চালু করে, তখন মাত্র ১ শতাংশ রেমিট্যান্স অনলাইনে হতো। কিন্তু কোভিড-১৯ এর সময় পরিস্থিতি বদলে যায়। রাশেদ বলেন, “ডিজিটাল লেনদেন ১ শতাংশ থাকাটা আমার কাছে স্বপ্ন ছিল। এখন আমরা ৩০ শতাংশে পৌঁছেছি এবং আগামী পাঁচ বছরে তা ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করছি। অ্যাপের মাধ্যমে কোনো কোনো মাসে ৬ লাখেরও বেশি লেনদেন হয়।”
এত কিছুর পরও অনেক গ্রাহক, বিশেষ করে গৃহকর্মী ও শ্রমিকরা অভ্যাস বা স্মার্টফোন না থাকার কারণে সরাসরি শাখায় আসতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পূর্তিতে আল আনসারি গর্বের সাথে জানান যে, এই দীর্ঘ সময়ে তারা কখনোই সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো জরিমানার সম্মুখীন হননি। তিনি বলেন, “আমরা কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে অন্যদের জন্য একটি মানদণ্ড হতে চাই এবং নতুন নিয়মগুলো যেন সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ না ফেলে, তা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রকদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি।”
সূত্র: খালিজ টাইমস






























