কানেকটিকাটের এক প্রত্যন্ত বনের মধ্যে অবস্থিত একটি বিশাল মধ্যযুগীয় দুর্গ। ড্রব্রিজ, গারগোইল আর আকাশচুম্বী চূড়া বিশিষ্ট এই দুর্গের মালিক ক্রিস মার্ক নামের এক খ্যাপাটে ষাটোর্ধ্ব ধনকুবের। ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকালে লেখক জন রনসনের ছেলে জোয়েল এবং তার বন্ধুরা ভুলবশত এই দুর্গে এক পার্টির আমন্ত্রণে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান কোনো পার্টি নেই, বরং ক্রিস মার্ক তাদের নিয়ে ‘১০১ প্রিন্সেসেস’ (১০১ রাজকুমারী) নামের একটি অদ্ভুত রিয়ালিটি শো তৈরির চেষ্টা করছেন। যেখানে তিনি নিজেকে ‘লর্ড’ এবং তরুণীদের ‘প্রিন্সেস’ হিসেবে উপস্থাপন করে নিজের জন্য ‘রানি’ খুঁজছিলেন।
এই অদ্ভুত ঘটনার পর জন রনসন নিজেই এই রহস্যময় দুর্গ এবং ক্রিস মার্কের জীবন নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। কানেকটিকাটের উডস্টক শহরের প্রান্তে অবস্থিত এই দুর্গটি আসলে নতুন তৈরি করা হয়েছে, যার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৩ সালে এবং শেষ হয় ২০১০ সালে। ক্রিস মার্কের এই বিপুল সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। তার প্রপিতামহ ক্লেটন মার্ক ছিলেন গিল্ডেড এজ বা স্বর্ণযুগের একজন ইস্পাত ব্যবসায়ী এবং ‘ক্লেটন মার্ক অ্যান্ড কোম্পানি’র মালিক। ২০১০ সালে ক্রিস মার্কের বিবাহবিচ্ছেদের মামলার সময় জানা যায়, অবহেলার কারণে তাদের একটি পোষা উট না খেয়ে মারা গিয়েছিল।
রনসন যখন নিজে এই দুর্গে যান, তখন তার অভিজ্ঞতা ছিল আরও অদ্ভুত। দুর্গের ভেতরে রয়েছে হট টাব গ্রোটো, কৃত্রিম উদ্ভিদ উদ্যান, বেগুনি আলো এবং পোল-ড্যান্সিং নাইটক্লাব। সেখানে তরুণীদের মধ্যযুগীয় পোশাক ও মুকুট পরিয়ে রাখা হতো। ক্রিস মার্ক ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে তরুণীদের ফাঁদে ফেলে দুর্গে নিয়ে আসতেন এবং নিজের মতো করে তাদের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করাতেন। রনসনকে এই দুর্গের ভেতরের কথা গোপন রাখার জন্য একটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করতে বলা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এনডিএ স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করার পর ক্রিস মার্কের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। রনসনকে লক্ষ্য করে তিনি একের পর এক হুমকিবার্তা পাঠাতে শুরু করেন। তিন ঘণ্টার একটি যাত্রাপথে তিনি রনসনকে ৪২টি বার্তা পাঠান, যেখানে তিনি দাবি করেন যে রনসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা নিয়োগ করা হয়েছে। এমনকি কার্লোস এবং ব্র্যান্ডন নামের দুই সাবেক বন্দিকে (যারা খুনের মামলায় সাজা খেটেছে) রনসনের পেছনে লেলিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। পরবর্তীতে মার্কের দীর্ঘদিনের বন্ধু, মুখপাত্র ও ব্যবসায়িক উপদেষ্টা চার্লস ক্যাডি জানান, ফেডারেল গোয়েন্দাদের সাথে বৈঠকের পর তিনি নিজেও স্তম্ভিত হয়ে গেছেন এবং মার্কের সাথে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করেছেন।
২০২৬ সালের আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী, ক্রিস মার্কের বিরুদ্ধে মার্কিন ফেডারেল তদন্ত এখনও চলছে। যদিও তার বিরুদ্ধে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। বর্তমানে তিনি সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থান করছেন। রনসনের মতে, ক্রিস মার্কের এই অদ্ভুত জীবন আসলে আধুনিক যুগে পুরুষত্ব সংকটের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। তিনি প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা হিউ হেফনারকে নিজের আদর্শ মানতেন এবং পোস্ট-#MeToo যুগে এসেও নিজের দুর্গে এক কাল্পনিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
এই ঘটনাটি কেবল ক্রিস মার্কের একার নয়, বরং এটি বর্তমান বিশ্বের অনেক পুরুষেরই দিকভ্রান্ত অবস্থার প্রতীক। ২০২২ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী প্রতি ছয়জন পুরুষের মধ্যে একজন কর্মহীন এবং তাদের দুই-তৃতীয়াংশ চাকরি খুঁজছেনও না। কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেক পুরুষই সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে বিজ্ঞাপনে পুরুষদের বোকা বা অদক্ষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বাড়ছে। যেমন ডমিনো’স পিজ্জা, ফিলাডেলফিয়া ক্রিম চিজ বা স্পেকসেভার্স-এর বিজ্ঞাপনে পুরুষদের আধুনিক জীবনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা ‘ডুফাস’ বা বোকা চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়। অভিনেতা এড, যিনি স্পেকসেভার্স-এর বিজ্ঞাপনে এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, জানান যে আজকাল পুরুষদের মার্লবোরো ম্যানের মতো বীরত্বপূর্ণ দেখানোর চেয়ে বোকা হিসেবে দেখানোই বেশি জনপ্রিয়। ক্রিস মার্কের মতো অনেকে তাই বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-কে নিজেদের একমাত্র সঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, যা তাদের একাকীত্ব ও বিভ্রান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।


























