একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চ্যাটের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ইউরো পাচার করে সংগঠিত অপরাধ ও উগ্রবাদে অর্থায়নের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর এক যৌথ অনুসন্ধানে। কোনো ধরনের কাগজের নথি বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড ছাড়াই এই গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বার্মিংহাম ও লন্ডনের মতো ব্রিটিশ শহরসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অর্থ পাঠানো হতো। এমনকি বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে পাঠানো অর্থ সিরিয়ায় সক্রিয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতেও পৌঁছেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (ইবিইউ) ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের এই অনুসন্ধানে বিবিসি অংশ নেয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অর্থ পাচার নেটওয়ার্ক কেবল উগ্রবাদে অর্থায়নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানব পাচার এবং মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধের ক্ষেত্রেও একইভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘ট্রেডার্স অব গ্রেটার ইউরোপ’ নামের ৫৩২ সদস্যের এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটিতে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২,০০০-এর বেশি বার্তা আদান-প্রদান করা হয়। বেলজিয়ামের তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট ভিনসেন্ট গুয়েরা প্রথম এই গ্রুপটির সন্ধান পান।
ম্যাজিস্ট্রেট ভিনসেন্ট গুয়েরা এই নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি সম্পর্কে বলেন, লেনদেনের পরিমাণ ছিল স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো এবং এই নেটওয়ার্কটি পুরো পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত ছিল। শুরুতে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের তদন্ত হিসেবে এটি শুরু হলেও পরবর্তীতে দেখা যায় এটি আসলে লেনদেনের মহাসমুদ্রের একটি বিন্দু মাত্র। তিনি আরও বলেন, এটি কোনো সাধারণ অপেশাদার কাজ নয়; এটি অত্যন্ত পেশাদার এবং এমন এক স্তরের যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। তারা মূলত সরকারি তদারকিহীন একদল ব্যাংকার।
গ্রুপের সদস্যরা মূলত প্রাচীন ‘হাওয়ালা’ পদ্ধতি ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের জন্য একে অপরের সঙ্গে আরবি ভাষায় যোগাযোগ করতেন। হাওয়ালা হচ্ছে বিশ্বস্ত অর্থ দালালদের (হাওয়ালদার) একটি নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে কোনো ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা কাগজের নোটের শারীরিক স্থানান্তর ছাড়াই বিশ্বজুড়ে অর্থ পাঠানো যায়। এই পদ্ধতিতে দুই প্রান্তের দুজন হাওয়ালদার নিজেদের মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। এক প্রান্তে টাকা জমা দেওয়ার পর অন্য প্রান্তের হাওয়ালদার কমিশন কেটে রেখে প্রাপককে সমপরিমাণ অর্থ বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে তারা নিজেদের মধ্যে হিসাব নিষ্পত্তি করে নেন।
যদিও অভিবাসী শ্রমিকরা ব্যাংকিং সুবিধা বঞ্চিত নিজ দেশে পরিবারের কাছে বৈধভাবে টাকা পাঠাতে প্রায়ই হাওয়ালা পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তবে অপরাধীরা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের ‘সুইফট’ (SWIFT) পদ্ধতি এড়াতে এর অপব্যবহার করে। সুইফট পদ্ধতিতে বড় অঙ্কের বা সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য ব্যাংকগুলো সাধারণত কর্তৃপক্ষকে জানাতে বাধ্য থাকে। ‘ট্রেডার্স অব গ্রেটার ইউরোপ’ গ্রুপটি মূলত ৫,০০০ ইউরো (৪,২৭৯ পাউন্ড) বা তার বেশি অঙ্কের লেনদেনের জন্য সংরক্ষিত ছিল। তবে গ্রুপটিতে যুক্ত সবাই অপরাধমূলক অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশে হাওয়ালা অবৈধ হলেও যুক্তরাজ্যে রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগে (এইচএমআরসি) নিবন্ধিত থাকলে এটি বৈধ।
২০২৪ সালে বেলজিয়ামের একটি আদালতে অর্থ পাচারের দায়ে ব্রাসেলস নেটওয়ার্কের প্রধান আবু আদম এবং তার সহযোগী আবু আহমেদসহ ছয়জনকে দোষী সাব্যস্ত করার পর ইবিইউ এই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাগুলোর সন্ধান পায়। বেলজিয়াম পুলিশ জানতে পেরেছিল যে, আসামিরা সিরিয়ার বন্দিশিবির থেকে আইএস জঙ্গিদের স্ত্রীদের পালাতে সাহায্য করার জন্য অর্থ পাঠাচ্ছিল। আবু আদমকে গ্রেপ্তারের পর তার ফোন থেকে এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটির খোঁজ মেলে। তার ফোনে ৫ ইউরোর নোটের ৬,০০০ ছবি (যার সিরিয়াল নম্বরগুলো হাওয়ালা লেনদেনের গোপন কোড হিসেবে ব্যবহৃত হতো) এবং ৬,০০০ পরিচয়পত্রের ছবি পাওয়া যায়। ম্যাজিস্ট্রেট গুয়েরার মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে আবু আদম অন্তত ১২,০০০ লেনদেন সম্পন্ন করেছিলেন। এই আবিষ্কারকে তিনি ‘জ্যাকপট’ পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
ইবিইউ ইউরোপজুড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে হাওয়ালা ব্যবহারের আরও প্রমাণ পেয়েছে। ফ্র্যাঙ্ক (ছদ্মনাম) নামের সাবেক এক অর্থ পাচারকারী ইবিইউ-কে জানান, তিনি নিজে কয়েকশো মিলিয়ন ইউরোর লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রটারড্যামের বাইরে একটি ছোট শহরের অফিসে তার এই পদ্ধতিতে হাতেখড়ি হয়, যেখানে মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে কয়েকজন বার্তাবাহক এসে প্রায় ১০ লাখ ইউরো লেনদেন করেন। ফ্র্যাঙ্ক বলেন, পরে আমি বুঝতে পারি এটি কেবল অর্থ লেনদেন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ত্রাসে অর্থায়ন, মাদক চোরাচালান, পতিতাবৃত্তি এবং আরও অনেক নোংরা বিষয়।
অস্ট্রিয়াতেও হাওয়ালা পদ্ধতির সঙ্গে মানব পাচার ও সহিংসতার গভীর সংযোগের প্রমাণ মিলেছে। অস্ট্রিয়ান ব্রডকাস্টার ওআরএফ-এর তদন্তে জানা যায়, ভিয়েনার একটি ব্যস্ত সড়কের পাশে কাবাব রেস্তোরাঁর আড়ালে চালানো হতো অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে বড় হাওয়ালা অফিস, যা মানব পাচারের অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত হতো। এটি পরিচালনাকারী দুই সিরীয় ভাইকে মানব পাচার এবং সাড়ে তিন লাখ ইউরো (তিন লাখ পাউন্ড) হারিয়ে ফেলার অভিযোগে এক কুরিয়ারকে নির্যাতন ও ধর্ষণের দায়ে গত বছর যথাক্রমে ১৮ বছর ও ৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া অস্ট্রিয়ান পুলিশ ও ইউরোপোল সম্প্রতি হাওয়ালা অর্থায়নে পরিচালিত আরেকটি মানব পাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে, যারা ১৮ মাসে প্রায় ১,০০,০০০ মানুষকে ইউরোপে পাচার করেছে।
অস্ট্রিয়ার অপরাধ তদন্ত সংস্থার (বিকে) মানব পাচার তদন্ত বিভাগের প্রধান জেরাল্ড ট্যাটজগর্ন ওআরএফ-কে বলেন, মানব পাচারের ক্ষেত্রে নির্যাতন একটি নির্মম বাস্তবতা এবং এটি মুনাফা বাড়ানোর জন্য করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে হাওয়ালা পদ্ধতির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১,০০০ বা কয়েক হাজার ইউরো দাবি করা হতো। অন্যদিকে পুলিশ কমান্ডার এবং ইউরোপোলের লিয়াজোঁ অফিসার কোয়েন্টিন মাগ বলেন, হাওয়ালা হলো সংগঠিত অপরাধের প্রধান অর্থ পাচার মাধ্যম। টাকাটা মানব পাচার থেকে আসছে নাকি কোনো প্রবাসী তার সন্তানকে জন্মদিনের উপহার পাঠাচ্ছেন—তা নিয়ে হাওয়ালদারদের কোনো মাথাব্যথা থাকে না, তারা কেবল তাদের কমিশন পেলেই খুশি।





























