মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও তেল অবরোধের মধ্যেই নিজেদের কমিউনিস্ট অর্থনীতিতে বড় ধরনের শিথিলতার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিউবা। দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকে সরাসরি বিদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে লেনদেন ও বাণিজ্য করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি দ্বীপরাষ্ট্রটিতে আবাসন খাতের উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নতুন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহ থেকেই এই নতুন নিয়মগুলো কার্যকর হতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সম্প্রতি ঘোষিত সংস্কারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে আইনে পরিণত হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে কিউবার এই পদক্ষেপকে দেশটির অর্থনীতি উন্মুক্ত করার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিউবার বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ বিষয়ক উপমন্ত্রী কার্লোস লুইস হোর্হে মেন্দেজ ইউএসএ টুডে-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, গত জুনে অনুমোদিত ১৭৬টি অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে এই পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো সাময়িক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বরং কিউবার অর্থনৈতিক নীতির একটি স্থায়ী পরিবর্তন। মেন্দেজ বলেন, "এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে কিউবা সত্যি উন্মুক্ত হচ্ছে। এটি একটি বাস্তব প্রক্রিয়া, কোনো রাজনৈতিক চালবাজি বা কৌশল নয়।"
গত জুনে যখন এই সংস্কারগুলোর কথা প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন বিশ্লেষক এবং মার্কিন ও কিউবান উদ্যোক্তারা একে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে মার্কিন সরকার বিষয়টিকে কেবলই 'লোকদেখানো' বলে মন্তব্য করেছে। এই সংস্কারগুলোকে কীভাবে স্থায়ী রূপ দেওয়া হবে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।
১৯৯৪ সাল থেকে কিউবার সঙ্গে কাজ করা ইউএস-কিউবা ট্রেড অ্যান্ড ইকোনমিক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জন কাভুলিক বলেন, কিউবার বেসরকারি খাতের অগ্রগতির জন্য এই সংস্কারগুলো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই পরিবর্তনগুলোকে স্থায়ী করতে হলে কিউবাকে তাদের সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে নেওয়া অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো পরবর্তী সময়ে কিউবান নেতৃত্ব বাতিল করে দিয়েছিল। কাভুলিক বলেন, "নীতিমালায় যত বেশি পরিবর্তন আনা হবে, তার স্থায়িত্ব নিয়ে তত বেশি প্রশ্ন উঠবে। কিউবার সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন এবং এর জন্য তাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।"
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চরম উত্তেজনার মধ্যেই কিউবা তাদের অর্থনীতি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য খুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নিল। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর নাতি রাউল গুইলারমো রদ্রিগেজ কাস্ত্রোর মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও তেল অবরোধের কারণে কিউবায় মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর থেকে দেশটির ওপর এমন সামরিক হুমকি আর দেখা যায়নি। গত ২০ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, "যতবারই তারা আমাদের তৈরি করা ফাঁস থেকে বের হওয়ার জন্য নতুন কোনো পথ খোঁজার চেষ্টা করে, আমরা তা আরও শক্ত করে বন্ধ করে দিই।"
উপমন্ত্রী মেন্দেজ নিশ্চিত করেছেন যে, দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের মধ্যকার আলোচনা স্থগিত রয়েছে। তবে তিনি বলেন, "আমরা আমাদের অবস্থানে অটল আছি এবং আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।" তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সব সংস্কার আইনে পরিণত হবে। মেন্দেজের ভাষায়, "আমরা এমন কিছু পরিবর্তন আনছি যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে এত গভীরভাবে বদলে দেবে যে তা পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে।"



























