প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (1 September 2026), ১২:০০ এএম
রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সামনে এখন জনপ্রিয়তা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ইতোমধ্যে ছয় মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট এবং পরবর্তীতে তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাসাবাড়ি, ফিলিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও বাজারব্যবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা এখনও সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলেও পুরোপুরি সফলতা দৃশ্যমান হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের তুলনায় বর্তমান সরকারের আমলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাই, খুন ও মব-সন্ত্রাসের মতো ঘটনা ঘটছে, যা শক্ত হাতে দমনের তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া দলের নেতাকর্মীদের আচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব হত্যাকাণ্ড এবং বিগত দেড় দশকের গুম-খুনের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা এবং বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করাও সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা।
এসব চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকার পরিচালনায় নানাবিধ চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে, তবে তা মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা বিএনপির আছে। জনগণের স্বার্থে কাজ করা এবং দেশের sovereignty বা সার্বভৌমত্বকে সংহত করাই সরকারের মূল কাজ। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই মানুষ মনে করে বিএনপি জনগণের পক্ষে কাজ করে এবং তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে সচেষ্ট থাকে।
অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং দেশ এক প্রকার স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি এই সংকট কাটিয়ে ভবিষ্যতে ভালো ভূমিকা রাখবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়া বিএনপির কাছে জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। রাষ্ট্র সংস্কারের সব দায়িত্ব এখন তাদের ওপর। তবে সম্প্রতি জ্বালানি সংকট ও দলীয় নেতাকর্মীদের কিছু কর্মকাণ্ড জনপ্রিয়তা ব্যাহত করছে, যা সরকারকে বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের সঙ্গে সামাল দিতে হবে।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও সরকারের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, তারেক রহমানের সামনে আগামী এক দশক দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলকে সুসংগঠিত রাখা এবং বেপরোয়া নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনা। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি বন্ধ ও প্রশাসনকে জনমুখী করার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন হবে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় ঐক্য ধরে রাখাও ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ-সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম সতর্ক করে দিয়ে বলেন, প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ এই সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই দায়িত্বজ্ঞানহীন চক্রের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সামনে ঘোর অন্ধকার অপেক্ষা করছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুসংহত করতে সব মতের সমন্বয়ে বিএনপি গঠন করেন। তার শাহাদাতের পর প্রথম সংকটে পড়া দলটির হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও দলটি বড় সংকটের মুখে পড়ে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দল ভাঙার নানা চক্রান্ত ও নির্যাতনের শিকার হলেও খালেদা জিয়ার দূরদর্শী দিকনির্দেশনা, লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং দেশে সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রশংসনীয় ভূমিকার কারণে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর এবার ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে দলটি। ২০০৭ সালের (2007) পর এবারই প্রথম সুসময়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের সুযোগ পেয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। টানা ৪১ বছর বিএনপির হাল ধরে রাখার পর গত বছরের ডিসেম্বরে দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পরলোকগমন করেন। তার মৃত্যুর পর শক্তভাবে দলের হাল ধরেন বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রথমবার সরকারে, অন্যদিকে দলের প্রধান হিসাবেও তার সময়ে এটি প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তার নেতৃত্বে বিএনপি কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় কোন্দল নিরসন এবং ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় দেওয়া ৩১ দফা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করাই হবে তাদের মূল পরীক্ষা।
দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর সকাল6টায় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং সকাল ৯টায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। ৫ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন-বাংলাদেশ মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেওয়া বাণীতে তারেক রহমান দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, দেশে যতবারই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে, ততবারই বিএনপি অতন্দ্র প্রহরীর মতো জীবন বিলিয়ে দিয়ে তা রক্ষা করেছে।






























