তাইওয়ান প্রণালীর নিরাপত্তা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে চীনের সাথে টানাপোড়েনের মধ্যেই বেইজিংকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার বার্তা দিচ্ছে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রশাসন। গত বছর জাপানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের বাজেট কমিটিতে দেওয়া তাকাইচির এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়, যার রেশ এখনও কাটেনি।
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর জাপানের নিম্নকক্ষের বাজেট কমিটিতে যৌথ আত্মরক্ষা অধিকারের আইনি প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলাকালে সানায়ে তাকাইচিকে প্রশ্ন করা হয়, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে জাপানের জন্য "অস্তিত্বের সংকট" তৈরি হতে পারে। এর উদাহরণ হিসেবে তাইওয়ান প্রণালীর প্রসঙ্গ উঠে আসে। তাকাইচির দেওয়া জবাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং। চীন জাপানের বিরুদ্ধে "নব্য-সামরিকবাদ"-এর অভিযোগ তোলে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় দ্বীপ শৃঙ্খলের মধ্যবর্তী জলসীমায় নিজেদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিশেষ করে বিমানবাহী রণতরীর কার্যক্রম জোরদার করে। একই সঙ্গে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে চীনের কোস্ট গার্ডের টহল মোয়েন করা হয়।
এই উত্তেজনার প্রভাব পড়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও। চীন জাপানি কোম্পানিগুলোর ওপর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করে, বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে কড়াকড়ি শুরু করে এবং জাপানের সাথে পর্যটন ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বিনিময় সীমিত করার পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক, স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষায়তনিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেইজিং তাকাইচিকে তার ৭ নভেম্বরের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানালেও তিনি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে তাকাইচি প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে তাদের তাইওয়ান নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ৭ নভেম্বরের সেই বক্তব্যের তিন দিন পর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর বাজেট কমিটির আরেকটি অধিবেশনে তাকাইচি বলেন, "তাইওয়ান প্রণালীর শান্তি ও স্থিতিশীলতা কেবল জাপানের নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। জাপান বরাবরই প্রত্যাশা করে যে সংলাপের মাধ্যমে তাইওয়ান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে।" এরপর ৩ ডিসেম্বর প্রতিনিধি সভার পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তাইওয়ান নিয়ে জাপানের মৌলিক অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তা ১৯৭২ সালের জাপান-চীন যৌথ ইশতেহারের অনুরূপ।
চীন-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাকাইচি সংলাপের পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর উভয় কক্ষের যৌথ কমিটির বৈঠকে তিনি বলেন, দুই পক্ষই "গঠনমূলক ও স্থিতিশীল জাপান-চীন সম্পর্ক গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, কোনো উদ্বেগ বা চ্যালেঞ্জ থাকলে তা নেতাদের মধ্যকার যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করা হবে এবং জাপান সব সময় চীনের সাথে গঠনমূলক সংলাপে উন্মুক্ত। এদিকে জাপানের ডায়েট (পার্লামেন্ট) সদস্যরা বারবার একটি প্রচলিত অবস্থান তুলে ধরে বলছেন যে তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং চীনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রভাব বিবেচনা করে যথাযথ সাড়া দেবেন।
২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি উচ্চকক্ষের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে তাকাইচি বলেন, জাপান চীনের সাথে বিভিন্ন স্তরের সংলাপের জন্য প্রস্তুত। একই সাথে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সমমনা দেশগুলোর সাথে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন, যা মূলত তার মার্চ মাসের ওয়াশিংটন সফরকে কেন্দ্র করে বলা হয়েছিল। সফর শেষে ২৬ মার্চ প্রতিনিধি সভায় দেওয়া বক্তব্যেও তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন।
আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিতব্য অ্যাপেক (APEC) সম্মেলনে তাকাইচি যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যার আয়োজক চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গত জুলাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাকাইচি বলেন, তিনি এই সফরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। যদিও সেখানে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা কম, তবে আয়োজক হিসেবে শি জিনপিংয়ের সাথে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ এড়ানো কঠিন হবে। সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক ইঙ্গিতের পর জাপানি ব্যবসায়ী ও সংসদীয় প্রতিনিধি দল চীন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে কতটা ভূমিকা রাখবে তা দেখার বিষয়।




























