প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৫৩। চট্টগ্রাম সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের অযোগ্যতা ও নিষ্ক্রিয়তার প্রেক্ষিতে সরকারের প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে আইনসম্মত ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ২৯ এপ্রিল বিচারপতি ফাতেমা নজিব এবং বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই সংক্রান্ত রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত এই রায় প্রদান করেন। প্রতিবেদনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সরওয়ার জাহান, তার স্ত্রী ড. ইসরাত জাহান এবং বোর্ডের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে চরম বিশ্বাসভঙ্গ বা 'ব্রিচ অব ট্রাস্ট'-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এবং ট্রাস্ট আইন, ১৮৮২ লঙ্ঘন করে একক কর্তৃত্বে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা, সম্পদের অপব্যবহার এবং নিজেদের লাভবান করেছেন। বোর্ডের বাকি সদস্যদের নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে আদালতের পূর্বের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আদালত জানায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৩৫(৭) ধারা অনুযায়ী চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতি), ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারেন। সেই ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটিয়ে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ওমর ফারুককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান আইনসম্মত। এর আগে সরওয়ার জাহান এই নিয়োগের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন, যা আদালত ভিত্তিহীন বলে বাতিল করেছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, আদালতের রায়ের পরেও একটি কুচক্রী মহলের যোগসাজশে প্রশাসক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, যা আদালত অবমাননার শামিল।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিতর্কের তালিকা দীর্ঘ। সরওয়ার জাহানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে জাল সনদের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক মামলা দায়ের করেছে। এছাড়া ভিসি নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে; ট্রেজারার শরীফ আশরাফুজ্জামানের ২০ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ আছে, খলিলুর রহমানের নির্দেশে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি মোজাম্মেল হককে বেআইনিভাবে অব্যাহতি দিয়ে শরীফ আশরাফুজ্জামানকে বসানো হয়। এছাড়া রেজিস্ট্রার মোদাচ্ছের আলীর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়েও রয়েছে জটিলতা। মূল মালিক রেজাউল আলমের কাছ থেকে সরওয়ার জাহান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বর্তমানে সেখানে দুটি ট্রাস্টি বোর্ড বিদ্যমান এবং মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে। আইনি জটিলতার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ট্রাস্টি বোর্ড রিট করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছর সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিলেও ট্রাস্টি বোর্ডের অসহযোগিতায় তিনি মাত্র দুই দিন দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন।
এ বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক জেসমিন পারভীন জানান, নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় বিস্তারিত এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে সরকারি আদেশের বিরুদ্ধে বারবার রিট দায়েরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুর্নীতির মামলা ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিতর্ক: জাল সনদের অভিযোগের তদন্তের ভিত্তিতে ইতোমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে সরওয়ার জাহানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা (এফআইআর) দায়ের করেছে। এর আগে ইউজিসির তদন্ত কমিটি সরওয়ার জাহান ও তার স্ত্রী ইসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ডজনখানেক অভিযোগের সত্যতা পায়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালে চার বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি মোজাম্মেল হককে বেআইনিভাবে অব্যাহতি দিয়ে খলিলুর রহমানের নির্দেশে শরীফ আশরাফুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার মোদাচ্ছের আলীকে ঘিরেও বিতর্ক রয়েছে; ২০২২ সালের ৮ মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের কালচারাল ফ্যাসিস্টদের সাথে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর উচ্ছেদের জন্য তৎকালীন ডিসিকে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন।
































