‘আপনারা কি কেউ দেখেছেন আমার মেয়েকে? এক বছর ধরে আমার মেয়ে নিখোঁজ। খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা আমার সন্তানকে খুঁজে দিন। গ্রামে আমার একটা ভিটেবাড়ি আছে। কেউ আমার মেয়েকে এনে দিতে পারলে পুরস্কার হিসেবে ওই ভিটেবাড়ি দিয়ে দেব।’ রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ডায়াসে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই নিজের আকুতি জানাচ্ছিলেন নিখোঁজ শিশু রূপা আক্তারের মা স্বপ্না আক্তার।
নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আজ রোববার ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে স্বপ্না আক্তারের মতো আরও ৪০টি পরিবারের মা-বাবা এসেছিলেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশায় কথা বলতে। প্রত্যেকের হাতে ছিল হারিয়ে যাওয়া সন্তানের ছবিসহ প্ল্যাকার্ড। কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ৩৭০ দিন বা ৮ দিন, আবার কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ৬,৫৫৩ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার কথা। সন্তানদের খুঁজে পেতে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে স্বপ্না আক্তারের সঙ্গে এসেছিল তাঁর ১০ বছর বয়সী বড় ছেলে মো. সিয়াম। তার হাতে ছিল তিন বছর বয়সী বোন রূপার ছবি। স্বপ্না জানান, তিনি স্বামী মো. রাজন ও দুই সন্তান নিয়ে ঢাকার পল্লবীতে থাকেন। তাঁর স্বামী ভ্যানে করে শিশুদের খেলনা বিক্রি করেন। গত বছরের ২৯ আগস্ট বাসার কাছের একটি দোকানের সামনে থেকে রূপা নিখোঁজ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক তরুণ রূপাকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এক বছরের বেশি সময় ধরে মেয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।
একই অনুষ্ঠানে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মো. নজরুল ইসলাম। তাঁর সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ১৫ বছরের ছেলে মো. তামিম ওরফে আবদুল্লাহ গত বছরের ২০ মে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। নজরুল ইসলাম বলেন, সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় কবিরাজ থেকে শুরু করে ‘জিন নামায়’ এমন মানুষের কাছেও গিয়েছেন তিনি। তিনি তাঁর সবকিছু দিয়ে হলেও সন্তানকে ফিরে পেতে চান।
নবাবগঞ্জের দোহায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দুই বছরের ছেলে মো. তোহা আদনানকে হারিয়েছেন তহুরা ইসলাম। তিনি জানান, ১ মাস ২০ দিন আগে ছেলেকে একটি কক্ষে মুঠোফোন দিয়ে বসিয়ে পাশের কক্ষে গিয়েছিলেন। পাঁচ মিনিট পর এসে দেখেন ছেলে নেই, বিছানায় শুধু মুঠোফোনটি পড়ে আছে। এ নিয়ে থানায় জিডি করা হয়েছে।
আড়াই বছর আগে বাড়ির সামনে খেলার সময় নিখোঁজ হয় চম্পা বেগম ও মো. সবুজ মিয়ার যমজ কন্যাসন্তান সামিয়া। চম্পা বেগম তাঁর কোলে থাকা অপর যমজ সন্তান লামিয়াকে দেখিয়ে বলেন, প্রতিবেশী একজনকে আসামি করে অপহরণ মামলা করলেও তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসেন আসামি। অথচ মেয়ের সন্ধান মেলেনি। ছয় মাস আগে টিকটকে একটি ভিডিও দেখে মেয়েকে যশোরের এক পরিবারে শনাক্ত করলেও পুলিশের কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেন চম্পা।
অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন চাঁদপুরের নিখোঁজ শিশু খাদিজার (৬) এবং ধামরাইয়ের শিশু গনেশের (৫) পরিবার। খাদিজা ১ হাজার ৯৭৪ দিন এবং গনেশ ৩৩৩ দিন ধরে নিখোঁজ। দিনাজপুর থেকে আসা মনিরুজ্জামান মনি জানান, গত বছরের মে মাসে বাসার সামনে থেকে নিখোঁজ হওয়া তাঁর আট বছরের মেয়ে মানতাশাকে উদ্ধারের জন্য মুক্তিপণের টাকা দিয়েও তাকে ফেরত পাননি।
তবে এই কান্নার ভিড়ে একমাত্র আশার আলো হয়ে এসেছিলেন আজাদ রহমান। কর্মক্ষেত্রের শত্রুতার জেরে গত বছরের জুলাই মাসে তাঁর সাত বছরের মেয়ে আশফিয়াকে টঙ্গীর বাসার সামনে থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। মেয়ের শোকে পাঁচ মাস পর মারা যান মা শামসুন্নাহার। অবশেষে গত মাসে পুবাইলের একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পুলিশ আশফিয়াকে উদ্ধার করে বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ১৭,৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬,৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২,৫৫০টি। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে, যার মধ্যে ২,০৩৮ জন শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। বাকিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান অনুষ্ঠানে জানান, ২০২৪ সালে সিলেটে শিশু মুনতাহা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের পর এক লাখ মানুষের পিটিশন স্বাক্ষরের মাধ্যমে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর দাবি ওঠে। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সিআইডির সহযোগিতায় ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন’ (মুন অ্যালার্ট) এবং টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯-এর পাইলট কার্যক্রম চালু করা হয়, যা বর্তমানে দেশব্যাপী কার্যকর রয়েছে। অনুষ্ঠানে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার, অমীমাংসিত মামলাগুলোর পুনঃতদন্ত এবং শিশু পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।



























