ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরির শক্তিশালী অগ্ন্যুৎপাতের কারণে দেশটির রাজধানী জাকার্তাসহ পশ্চিমাঞ্চলের আকাশে বিশাল ছাইয়ের মেঘ ছড়িয়ে পড়েছে। রবিবারের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে দেশটির প্রধান প্রধান বিমানবন্দরসহ মোট আটটি বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে দেড় লক্ষাধিক যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ইন্দোনেশিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১ হাজার ৫৫৮টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল জাকার্তার সোকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দর থেকেই বাতিল হয়েছে ৯৬৩টি ফ্লাইট। এর ফলে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। সোকার্নো-হাত্তা ও হালিম পারদানাকুসুমা এবং লাম্পুং প্রদেশের রাদিন ইন্তেন ২ সহ মোট আটটি বিমানবন্দর সোমবার সকাল ৮টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এয়ারন্যাভ ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, বাতাসে বিপজ্জনক মাত্রায় আগ্নেয়গিরির ছাই ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক মহাপরিচালক লুকমান এফ লাইসা এক বিবৃতিতে বলেন, "আমাদের প্রতিটি কার্যক্ষম সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।" তিনি সতর্ক করে বলেন, ফ্লাইট বাতিলের এই ঘটনার ফলে বিমানের শিডিউল বিপর্যয় এবং টার্মিনালের ধারণক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে, যা সামাল দিতে বিমান সংস্থাগুলোকে বেগ পেতে হবে।
স্প্যানিশ পর্যটক ডিয়েগো উরদিয়ালেস, যিনি মাদ্রিদে নিজের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তিনি বলেন, "এটি অবশ্যই একটি বড় ভোগান্তি। এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথা ছিল… কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো খবর পাইনি।" অন্যদিকে, মিশেল গোউ নামে এক ইন্দোনেশীয় যাত্রী বলেন, "এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এখানে কারও হাত নেই। তাই আমাদের এটি মেনে নিতেই হবে এবং এয়ারলাইন ও বিমানবন্দরের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।"
ইন্দোনেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানায়, জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালীতে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরিটি গত শুক্রবার থেকেই সক্রিয়তার লক্ষণ দেখাচ্ছিল। এরপর রবিবার ভোরে এটি প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে তীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়। সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকা থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, আগ্নেয়গিরি থেকে আকাশে লাভা ও জ্বলন্ত পাথর ছিটকে পড়ছে। কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্রে দুটি বিশাল ছাইয়ের মেঘ সনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছাইয়ের মেঘ ২০,০০০ ফুট উঁচুতে উঠে জাকার্তা, বানতেন ও পশ্চিম জাভার দিকে ভেসে গেছে। অন্য আরেকটি মেঘ প্রায় ৫০,০০০ ফুট উঁচুতে পৌঁছে বানতেন, লাম্পুং, বেঙ্কুলু প্রদেশ এবং ভারত মহাসাগরের একাংশে ছড়িয়ে পড়েছে।
অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং কোনো উচ্ছেদ আদেশও জারি করা হয়নি। নিকটবর্তী জনবসতিটি আগ্নেয়গিরি থেকে ১০ মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত। তবে কর্তৃপক্ষ জনসাধারণকে জ্বালামুখ থেকে অন্তত ২ মাইল দূরে থাকার জন্য সতর্ক করেছে। বিমান চলাচলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনেও এর প্রভাব পড়েছে। আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্কুলগুলোকে সাময়িকভাবে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা বিষাক্ত ছাইয়ের সংস্পর্শ থেকে রক্ষা পায়।
ইন্দোনেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার প্রধান লানা সারিয়া জানান, গত জুলাই মাস থেকে আনাক ক্রাকাতাও-এর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং রবিবারের অগ্ন্যুৎপাতটি ছিল এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। তিনি বলেন, ঘন ঘন অগ্ন্যুৎপাত প্রমাণ করে যে মাটির নিচে এখনও ম্যাগমা ও গ্যাসের সরবরাহ রয়েছে। তবে পরবর্তীতে আরও বড় কোনো বিস্ফোরণ ঘটবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, বাতাসে ছাই, উচ্চমাত্রার বিষাক্ত গ্যাস এবং গরম পাথর ছিটকে পড়াই এখন প্রধান ঝুঁকি।
'আনাক ক্রাকাতাও' নামের অর্থ 'ক্রাকাতাও-এর সন্তান'। এর মূল আগ্নেয়গিরি ক্রাকাতাও ১৮৮৩ সালে এক প্রলয়ঙ্কারী অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়েছিল, যার ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আনাক ক্রাকাতাও-এর এক অগ্ন্যুৎপাতে সুমাত্রা ও জাভায় অন্তত ৪৩০ জন নিহত হন। বিজ্ঞানীদের মতে, সে সময় আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার কারণে পানির নিচে একটি বিশাল ভূমিধস ঘটেছিল, যা সুনামির সৃষ্টি করে। ওই ঘটনার পর আনাক ক্রাকাতাও দ্বীপটি তার মূল আকারের মাত্র এক-চতুর্থাংশে সংকুচিত হয়ে যায়।

























