ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ের ভোটের রাজনীতিসহ নানারকম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। কোথাও শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ দলের উসকানিমূলক তির্যক মন্তব্য এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ইন্ধন জোগাচ্ছে। কোথাও আবার মিছিল, পথসভা, পোস্টার লাগানো এবং স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বে সরকারি দল বিএনপির নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাকর্মীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন।
এখন পর্যন্ত দেড় বছরে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ছোট-বড় অন্তত ১৮টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এনসিপির দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। মাঝেমধ্যে জামায়াতের সঙ্গেও বিএনপির সংঘর্ষ হয়েছে। সর্বশেষ হামলার ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জে। এতে অনেকের হাত-পা ভেঙে যাওয়াসহ একজনের চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় এনসিপির ওপর বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যদিও এমন অভিযোগ বিএনপি মানতে নারাজ।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম হবিগঞ্জে হামলার জন্য স্থানীয় বিএনপি নেতা জিকে গউছের অনুসারী ছাত্রদল ও যুবদলকে সরাসরি দায়ী করেন। বুধবার যুগান্তরের কাছে একই অভিযোগ করেন এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন এবং যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন। তারা বলছেন, এনসিপি নেতারা জনগণের ভাষায় প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু বিএনপি তা সহ্য করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের চেয়েও অসহনীয় হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সভ্য ভাষা ও সভ্য শব্দ ব্যবহার করা উচিত। তারা জানান, বর্তমানে রাজনীতিতে কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার এবং একের পর এক ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। এটি বন্ধ না হলে জনগণ এর জবাব দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি মনে করেন, প্রতিবাদের ভাষা প্রতিবাদী বক্তব্যের মধ্য দিয়েই হতে পারে, কিন্তু তাই বলে হামলা ও নির্যাতন হতে পারে না। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনাও প্রতিবাদের ভাষা রুখে দিতে সব চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। তিনি মনে করেন, সেখান থেকে বিএনপির অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, স্থানীয় পর্যায়ের এসব সংঘাত রাজনীতির কেন্দ্রেও বড় আঘাত হানতে পারে। এখনই সতর্ক না হলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নেবে। জুলাই বিপ্লবের সতীর্থদের এ ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছু নয়।
উল্লেখ্য, গণ-অভ্যুত্থানের সামনের সারির সমন্বয়করা গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপি গঠন করে। এরপর থেকে থেমে থেমে এই দলের নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হন। উল্লেখযোগ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে গত বছর এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বরিশালে। ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে, জানুয়ারিতে নোয়াখালীর হাতিয়ায়, ৬ জুলাই সাভারে জুলাই পদযাত্রা শেষে সমাবেশে ককটেল হামলা এবং ১৯ জুলাই ফের হাতিয়ায় হামলার ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা শেষে কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন, যার মধ্যে ২/৩ জনের হাত-পা ভেঙে গেছে এবং একজনকে চোখে মারাত্মক আহত অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়েছে। এমনকি গণমাধ্যমকর্মী ও ভাড়া করা মাইক্রোবাসের চালকও রেহাই পাননি।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, বিএনপি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করছে। হবিগঞ্জে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এনসিপির ওপর হামলা হচ্ছে, কিন্তু কোনো ঘটনার বিচার পাওয়া যায়নি। পুলিশের সামনে মারধর হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দল থেকে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এনসিপি দলীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার নেত্রকোনায় মেয়রপ্রার্থী সোহাগ মিয়া প্রীতমের ওপর হামলা হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ছাত্রদলের হামলা, ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে মির্জা আব্বাসের সমর্থকদের সম্পৃক্ততায় হামলা ও ডিম ছুড়ে মারা এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছাত্রদলের বিরুদ্ধে এনসিপি সমর্থিত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ-সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর ওপর এ পর্যন্ত ৫-৬ বার হামলা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও বিএনপির সাবেক নেতা মনজুর আলমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে যুবদলের নেতাকর্মীরা তাকে ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করেন বলে এনসিপির যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবশক্তি’ অভিযোগ তোলে।
এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, এনসিপিকে সহ্য করতে পারছে না বিএনপি। এনসিপির প্রতিবাদী ভাষাকে সাধারণ মানুষ সমর্থন করছে, কিন্তু বিএনপি তা সহ্য করতে না পেরে ফ্যাসিস্টদের অনুসারী হচ্ছে। অন্যদিকে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ-সদস্য থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের চরিত্রহনন এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের পরিবারের নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথা বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, যারা আজ অস্থিরতা তৈরি করছে, অতীতে দেখা গেছে তাদেরই এর মাশুল দিতে হয়েছে।

































