দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রধান মঞ্চ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবনের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এই সংস্থাকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে এবার অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে মালদ্বীপ ও বাংলাদেশসহ অঞ্চলের ছোট দেশগুলো।
গত ২৬ জুলাই মালদ্বীপের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রতি আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানান। আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার স্বার্থে সব সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের মধ্যকার মতভেদ ভুলে কাজ করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, মালদ্বীপ এই আলোচনা শুরু করতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত। এটি সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক আহ্বান; এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সংস্থার ৪০তম চার্টার দিবসেও তিনি একই অনুরোধ করেছিলেন।
মালদ্বীপের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সার্কের মহাসচিব গোলাম সারোয়ারের সাথে সাক্ষাতে তিনি সংস্থার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দারিদ্র্য বিমোচন, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এপ্রিল মাসে তিনি জানান, সার্কের পুনরুজ্জীবন প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই প্রথম সার্ক প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সার্ক পুনরুজ্জীবনের এই দাবি শুধু বাংলাদেশ ও মালদ্বীপে সীমাবদ্ধ নেই; শ্রীলঙ্কা ও নেপালের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও একই ধরনের ইতিবাচক মনোভাব দেখা যাচ্ছে। তবে ঐতিহাসিকভাবেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক সার্কের কার্যকারিতা বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ১৯৮৫ সালে ঢাকা সনদ স্বাক্ষরের সময় থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সন্দেহের কারণে সংস্থার কর্মপরিধি কেবল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যা বিতর্কিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোকে আলোচনার বাইরে রাখে।
২০১৪ সালের পর থেকে সার্কের কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে হামলার অভিযোগ এবং ভারতের অংশগ্রহণে অস্বীকৃতির কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সার্ক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের হার মাত্র ৫ শতাংশ। এর বিপরীতে ভারত বর্তমানে বিমসটেক (BIMSTEC) বা পাকিস্তানবিহীন অন্যান্য আঞ্চলিক কাঠামোর দিকে বেশি ঝুঁকছে।
তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগের সাথে তুলনীয়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির কারণে ছোট দেশগুলো তাদের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে আঞ্চলিক জোটের ওপর নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি ভারতের জন্যও একটি আঞ্চলিক ব্লকে সক্রিয় থাকা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ভারত ও পাকিস্তান এখনো তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি, তবে ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব উপেক্ষা করা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।





























