রাজধানীর গুলিস্তান এলাকাটি বঙ্গভবন এবং পুলিশ সদর দপ্তরের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। বঙ্গভবন থেকে গুলিস্তান স্কয়ার মোড়ের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৬০০ মিটার। সচিবালয় ও সিটি করপোরেশনও এখান থেকে কয়েক মিনিটের দূরত্বে। এত গুরুত্বপূর্ণ ও সরকারি স্থাপনার কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও এলাকাটি যেন অপরাধীদের এক নিরাপদ ‘আখড়া’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
গুলিস্তানে পকেটমারি ও ছিনতাই নিত্যদিনের ঘটনা। বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীদের কানের দুল বা মুঠোফোন টান দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ১০ আগস্ট গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনতাইয়ের সময় তার কান ছিঁড়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষ, এমনকি পুলিশ কর্মকর্তারাও সেখানে ব্যক্তিগত মুঠোফোন বের করতে সতর্ক থাকেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খুব প্রয়োজন না হলে তিনি পকেট থেকে মুঠোফোন বের করেন না, বরং এয়ারবাড ব্যবহার করেন।
গুলিস্তান শব্দের অর্থ ফুলের বাগান হলেও বর্তমানে এটি বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের জন্য পরিচিত। ১৯৫৩ সালে পল্টন মাঠের পাশে ও ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের উত্তরে এই এলাকায় গুলিস্তান সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। চলচ্চিত্রবিষয়ক খ্যাতিমান সাংবাদিক অনুপম হায়াৎ লিখেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতার চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোশানি ঢাকায় চলে আসেন এবং এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। এটি ছিল ঢাকার প্রথম শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এটি শিল্প-সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত থাকলেও এখন এলাকাটি অপরাধপ্রবণ বলেই পরিচিত।
চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও গুলিস্তান এক বিশৃঙ্খল এলাকা। ৯, ১০ ও ১১ আগস্ট সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফুটপাত ও রাস্তার বড় অংশ হকারদের দখলে। হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদার পরিমাণ দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা। বিপণিবিতান ঘেঁষে দোকান বসাতে মাসিক ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়। জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি ফুটপাত থেকে চাঁদা তুলছিলেন। হকারদের দাবি, ‘বেচাবিক্রি হোক আর না হোক, প্রতিদিন ৩০০ টাকা দেওয়া লাগে।’
ইতালিয়ান সোসিওলজিক্যাল রিভিউ নামক সাময়িকীতে ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ফুটপাতে ব্যবসা চালানো হকারদের ৭০ শতাংশকে কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে। আগে একদলের নেতারা চাঁদা তুলত, এখন অন্য দলের নেতারা তুলছে।
সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সামনে ভ্যানে পোশাক বিক্রেতাদের কাছ থেকে রসিদ দিয়ে চাঁদা তোলা হয়, যেখানে ইজারাদার হিসেবে বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ নিয়াজ মোর্শেদের নাম রয়েছে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, এই রসিদগুলো বৈধ নয়। এছাড়া মোজাম্মেল হক মজু, মো. আবদুল বাসেত, মীর আল মামুন, আখতার হোসেন রানা, মনির হোসেন (টিটু), আবু সুফিয়ান ও মো. জসিম উদ্দিনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্তদের কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করে একে প্রতিহিংসা বা জামায়াতের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গণি জানিয়েছেন, গুলিস্তানে অপরাধ দমনে পুলিশ সচেষ্ট থাকলেও অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গুলিস্তানে প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ, প্রতারণা ও চোরাই পণ্যের কারবারও চোখের সামনেই চলছে।
































