ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েক ডজন অভিবাসীকে চরম দরিদ্র ও সংঘাত-জর্জরিত মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে (সিএআর) নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ অপরিচিত ও বিপজ্জনক এই আফ্রিকান দেশে নথিপত্রহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এসব অভিবাসী।
তাদেরই একজন ৩১ বছর বয়সী কিউবান অভিবাসী ইয়াসমানি মোরেনো দে আরমাস। গত বছর পর্যন্ত তিনি ফ্লোরিডায় বসবাস ও কাজ করছিলেন। গত জুলাইয়ের শেষভাগে তাকেসহ ইকুয়েডর, হলেওন্ডুরাস, সার্বিয়া, রাশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো বিভিন্ন দেশের বন্দিদের মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়। রাজধানী বাঙ্গুইয়ের একটি ভবন থেকে ভিডিও কলে সিবিএস নিউজকে স্প্যানিশ ভাষায় মোরেনো বলেন, "আমরা এখান থেকে বের হতে পারছি না। আমাদের কাছে কোনো নথিপত্র নেই। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি মহাদেশে আমরা চরম কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি এবং পরিবারের জন্য ছটফট করছি।" নির্বাসনের আগে তিনি কখনো এই দেশটির নামও শোনেননি বলে জানান।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশগুলোর একটি। সশস্ত্র সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রুশ ভাড়াটে সেনাদের উপস্থিতির কারণে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক অঞ্চল। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টও তাদের নাগরিকদের জন্য দেশটিতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ 'লেভেল ৪' সতর্কবার্তা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জারি করে রেখেছে। ট্রাম্প সরকারের অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে যে ৩০টিরও বেশি দেশের সাথে তৃতীয় দেশে নির্বাসনের চুক্তি করা হয়েছে, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র তার একটি। এই তালিকায় এমন অনেক আফ্রিকান দেশ রয়েছে যেখানে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সশস্ত্র সংঘাত চলছে।
একইভাবে নির্বাসিত হয়ে সেখানে আটকা পড়েছেন ৩৯ বছর বয়সী ইরিত্রিয়ান নাগরিক জেনা গেব্রগজাবের। ম্যারিল্যান্ডে ট্রাক চালক হিসেবে কর্মরত জেনার স্ত্রী ও ৫ বছর বয়সী ছেলে মার্কিন নাগরিক। ভিডিও কলে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমি আমার পরিবারকে খুব মিস করছি। আমার ছেলে প্রতিদিন তার মায়ের কাছে জানতে চায়, তার বাবা কোথায়?" জেনার স্ত্রী ইয়ারগালেম গেহেরেহিওয়েত এই নির্বাসনকে "অন্যায় এবং অমানবিক" বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, বাবার অনুপস্থিতি তাদের ৫ বছর বয়সী ছেলে নাথানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সিবিএস নিউজ অনুসন্ধান করে এই দুই ব্যক্তির ট্রাফিক বা অভিবাসন সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন (যেমন অবৈধভাবে প্রবেশ) ছাড়া অন্য কোনো অপরাধের রেকর্ড পায়নি। মূলত যেসব দেশের সরকার (যেমন কিউবা) যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের নাগরিকদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায় বা সীমিত আকারে নেয়, অথবা যারা নিজ দেশে ফিরে গেলে নির্যাতনের শিকার হতে পারেন বলে মার্কিন আদালতে আইনি সুরক্ষা পেয়েছেন, তাদেরই ট্রাম্প প্রশাসন এই দূরবর্তী তৃতীয় দেশগুলোতে নির্বাসিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই চুক্তির শর্ত বা বিনিময়ে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র কী সুবিধা পাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মোরেনো দে আরমাস ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে নৌকায় করে ফ্লোরিডায় আসেন এবং তৎকালীন 'ওয়েট ফুট, ড্রাই ফুট' নীতির আওতায় সাময়িক অনুমতি পান। পরে কিউবান অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে গ্রিন কার্ডের আবেদন করলেও তা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জমা দেওয়ায় বাতিল হয়ে যায়। আইনি বৈধতা না থাকায়, ২০২৫ সালের মে মাসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে গ্রেফতার হন মোরেনো দে আরমাস এবং এই গ্রীষ্মে আফ্রিকায় নির্বাসিত করার আগে প্রায় এক বছর তিনি ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) হেফাজতে কাটান। কিউবায় কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার কারণে আগে কারাবরণ করায় সেখানে নিজের জীবননাশের আশঙ্কা করছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, জেনা গেব্রগজাবের ২০১৭ সালে মার্কিন অভিবাসন আদালত থেকে 'কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার'-এর আওতায় ইরিত্রিয়ায় ফেরত না পাঠানোর সুরক্ষা পেয়েছিলেন। ১৮ বছর বয়সে ইরিত্রিয়ান সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে চেকপয়েন্ট গার্ড হিসেবে কাজ করার কারণে তাকে স্থায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়নি, কারণ বিচারকদের মতে তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের পালাতে বাধা দিয়েছিলেন। যদিও তিনি নিজে কাউকে আঘাত বা গ্রেফতার করেননি বলে জানিয়েছেন। ছুটি শেষে ব্যারাকে না ফেরায় ইরিত্রিয়া সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন এবং পরে পালিয়ে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। আইনি সুরক্ষার কারণে তাকে ইরিত্রিয়ায় পাঠানো না গেলেও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো তৃতীয় দেশে পাঠানো আইনিভাবে আটকানো যায়নি। গত বছর নিয়মিত হাজিরা দিতে গেলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
বর্তমানে ভাষা না জানা এবং কোনো আত্মীয়স্বজন বা যোগাযোগহীন এই দেশে কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছেন এই দুই ব্যক্তি। মোরেনো দে আরমাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যদি কাউকে নির্বাসন দিতেই হয়, তবে তাকে তার নিজের দেশে পাঠানো উচিত, এমন কোনো দেশে নয় যার সংস্কৃতি সম্পর্কে সে কিছুই জানে না।"






























