ফুটবল মরসুমের প্রথম দিনটি সবসময়ই এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর আশঙ্কার জন্ম দেয়। চলতি মরসুমের শুরুতেই বেশ কিছু বড় দল হেরে গেছে, অনেকের পারফরম্যান্সই ছিল হতাশাজনক। আবার কেউ কেউ জয় দিয়ে শুরু করেছে, সেন্ট জেমস পার্কে দেখা গেছে ড্র। এই প্রথম ম্যাচ ঘিরেই সমর্থক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, চলছে ইতিবাচক ও নেতিবাচক নানা ভবিষ্যদ্বাণী। তবে ফুটবলপ্রেমীদের মনে রাখা উচিত, প্রথম ম্যাচের ফলাফল দেখে পুরো মরসুমের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলা মস্ত বড় ভুল, বিশেষ করে যখন দলবদলের বাজার বা ট্রান্সফার উইন্ডো এখনও বন্ধই হয়নি।
গত রবিবার সেন্ট জেমস পার্কে নিউক্যাসলের ম্যাচটি দেখে লেখকের মনে পড়ে যায় ৪৭ বছর আগের এক স্মৃতির কথা। ১৯৭৯ সালের সেই মরসুমের প্রথম দিনে তিনি প্রথমবার পা রেখেছিলেন এই স্টেডিয়ামে। তখন অবশ্য পুরো পরিবেশটাই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরের মাসে পলিটেকনিকে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে তিনি শহরে এসেছিলেন। সে সময় ভার্জিন মেগাস্টোর থেকে তিনি কিনেছিলেন বি বপ ডিল্যাক্সের ‘লাইভ ইন দ্য এয়ার এজ!’ অ্যালবাম। সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছের খিলানের নিচে অস্বাস্থ্যকর সাদা গাড়ি থেকে বিক্রি হতো ওয়েস্টলার্স হট ডগ, যা ক্ষুধার্ত দর্শকরা গোগ্রাসে গিলত। স্টেডিয়ামের পাশেই ছিল নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির ফ্ল্যাট ‘ক্যাসেল লিজেস’, যা আজ আর নেই।
সেদিনের সেই স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতি আজকের মতো এত বিশাল না হলেও উন্মাদনা কম ছিল না। টিকিট কেটে সরাসরি মাঠে ঢোকা যেত, যার দাম ছিল মাত্র ১.৫০ পাউন্ড (যা আজকের মূল্যে প্রায় ৮ পাউন্ড)। দ্বিতীয় বিভাগের সেই ম্যাচে ১৯,০০০ দর্শকের সামনে ওল্ডহ্যামকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছিল নিউক্যাসল। অতিরিক্ত সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন অ্যালান শোল্ডার। ম্যাচ শেষে সমর্থকরা ভিড় জমাতেন ‘দ্য স্ট্রবেরি’ নামের এক ছোট ও ধোঁয়াটে সরাইখানায়, যেখানে মাত্র ৩৩ পেনিতে মিলত এক পিন্ট এক্সিবিশন বিয়ার। সেটির দেয়ালগুলো নিকোটিনের রঙে বাদামি হয়ে গিয়েছিল, যা অনেকটাই নাইজেল ফারাজের কৃত্রিম ট্যানের রঙের মতো।
তৎকালীন গ্যালোগেট এন্ড ছিল ছাদবিহীন এক গ্যালারি, যা ১৯৫০-এর দশকের কথা মনে করিয়ে দিত। লেখকের পরিচিত আয়ারসোম পার্কের চেয়েও এটি ছিল অনেক অনুন্নত। সে সময় মাঠে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় থাকলে গ্যালারি থেকে বর্ণবাদী মন্তব্য ধেয়ে আসত, এমনকি কলা ছুঁড়ে মারাও খুব সাধারণ বিষয় ছিল—যা আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়। তখনকার দিনে ক্লাবের নিজস্ব জার্সি পরার কোনো রেওয়াজ ছিল না। গ্রিন মার্কেটে ক্লাবের ছোট একটি দোকানে কেবল পেন্যান্ট আর ম্যাচ প্রোগ্রাম বিক্রি হতো।
সেই প্রথম ম্যাচে নাটকীয় জয়ের পর নিউক্যাসল সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল। এমনকি ক্রিসমাসের সময়ও তারা টেবিলের শীর্ষে ছিল। কিন্তু মরসুম শেষে তাদের অবস্থান ছিল নবম স্থানে; শেষ ১৬টি ম্যাচের মধ্যে তারা জিতেছিল মাত্র একটিতে। সেবার প্রমোশন পেয়েছিল সান্ডারল্যান্ড, বার্মিংহাম এবং লেস্টার। অর্থাৎ, প্রথম ম্যাচের জয় বা পরাজয় আগামী নয় মাসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। গত মরসুমেও লিভারপুল তাদের প্রথম পাঁচটি ম্যাচ জিতেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পরিণতি কী হয়েছিল তা সবারই জানা।
১৯৭৯ সালে দাঁড়িয়ে সেন্ট জেমস পার্কের আজকের এই রূপ কল্পনাও করা যেত না। নিউক্যাসল তাদের খেলোয়াড় বার্সেলোনার কাছে বিক্রি করবে, ব্লাইথের একজন ডিফেন্ডার খেলবেন বিশ্বকাপে কিংবা মিডফিল্ডে দাপিয়ে বেড়াবেন একজন ব্রাজিলিয়ান তারকা—এমনটা তখন কেউ ভাবতেই পারত না। তাই প্রথম ম্যাচের পর অতি-বিশ্লেষণ বা হতাশা প্রকাশ করা কেবলই আবেগতাড়িত বাড়াবাড়ি। মরসুমটি অনেক দীর্ঘ এবং খেলোয়াড়দের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এর মাঝেই দলবদলের বাজারে সান্ডারল্যান্ডের ৩.৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের এক খেলোয়াড়কে দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ওয়েস্ট হ্যাম, বার্নলি এবং হাল সিটি। ফলে দলগুলো এখনও নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।




























