২০২৬ সালের জুলাই মাসে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো অনুপস্থিত ছিলেন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের চার অংশীদার দেশ বা 'আইপি৪' (অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়া)-এর শীর্ষ নেতারা। আপাতদৃষ্টিতে একে ন্যাটো ও আইপি৪ সম্পর্কের অবনতি হিসেবে মনে করা হলেও, গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায় এই অংশীদারিত্বের মূল ভিত্তি এখনো বেশ মজবুত।
বিশ্লেষকদের মতে, আইপি৪ নেতাদের অনুপস্থিতির প্রধান কারণ অংশীদারিত্বের প্রতি আগ্রহের অভাব নয়, বরং শীর্ষ সম্মেলনের কাঠামোগত পরিবর্তন। ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে দুই দিনব্যাপী উত্তর আটলান্টিক কাউন্সিল (ন্যাক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের সম্মেলনগুলোতে তা কমিয়ে মাত্র এক দিনে নামিয়ে আনা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংক্ষিপ্ত মনোযোগের কারণে এই সময়সূচি সংকুচিত করতে হয়েছে বলে একজন মিত্র দেশের কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এই কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে ন্যাক-এর মূল আলোচনা থেকে অংশীদার দেশগুলোকে বাদ দিতে হয়েছে। ফলে আইপি৪ নেতারা আমন্ত্রিত হলেও ন্যাক-এর মূল বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল না। রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যস্ত সূচির মধ্যে এই ধরনের আংশিক আমন্ত্রণ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের তুলনায় কম গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নেতাদের অনুপস্থিতি মানেই সম্পর্কের অবনতি নয়। ২০২৪ সালের মধ্যেই এই চার দেশ ন্যাটোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে নিজস্ব অংশীদারিত্ব চুক্তি (আইটিপিপি) স্বাক্ষর করেছে এবং বেলজিয়ামে ন্যাটোর জন্য ডেডিকেটেড রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছে। তারা ইউক্রেন যুদ্ধ, সাইবার প্রতিরক্ষা, অপপ্রচার রোধ এবং প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ন্যাটোর সাথে কাজ করছে।
তাছাড়া, মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের পর্যায়ে এই সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। আঙ্কারা সম্মেলনে আইপি৪ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা (অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা শিল্প বিষয়ক মন্ত্রী) অংশ নিয়েছেন এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করেছেন। ২০২৫ সালে ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুটে টোকিও সফর করেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই জোটকে ধরে রাখতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোটের ভঙ্গুর সম্পর্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় ভাগ করে নেওয়ার চাপ এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে মার্কিন সহায়তার দাবির মুখে এই দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এছাড়া চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে বহুমুখী সংঘাতের আশঙ্কা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে। জাপান ইতিমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষণীয় বিষয়গুলোকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিমালায় যুক্ত করছে, যা চলতি বছরের শেষের দিকে প্রকাশ পাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্প খাতেও বাস্তবমুখী সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ভাগাভাগি করার জন্য ন্যাটোর 'স্টারলিফ্ট' প্রকল্পে আইপি৪ দেশগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। জাপান ন্যাটোর 'ডিফেন্স ইনোভেশন অ্যাক্সিলারেটর ফর দ্য নর্থ আটলান্টিক' (ডায়ানা)-তে যুক্ত হওয়ার পথ খুঁজছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া ন্যাটোর সাথে যৌথ ক্রয় চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে এবং অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে ন্যাটোর সাপোর্ট অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট অর্গানাইজেশনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।































