যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সংলগ্ন মেক্সিকোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য তামাউলিপাসে একটি জ্বালানি চোরাচালান চক্রের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বেঙ্গল টাইগার, হায়েনা ও উটসহ ১৩৫টি বিদেশি ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন দেশটির কর্তৃপক্ষ। সামরিক বাহিনীর একটি দল মূলত জ্বালানি চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করেছিল, যার সূত্র ধরে একটি খামারবাড়ি (র্যাঞ্চ) থেকে এই বিপুল পরিমাণ প্রাণী উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে সিংহ, মহিষ, সুলকাটা কচ্ছপ, স্পাইডার মাঙ্কি (মাকড়সা বানর), জাগুয়ার, আমেরিকান বাইসন এবং সবুজ ম্যাকাও পাখি। মেক্সিকোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের মধ্যে সবুজ ম্যাকাও ও সুলকাটা কচ্ছপসহ অন্তত ৩৫টি প্রাণী বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকাভুক্ত।
মেক্সিকোর ধনী মাদক পাচারকারীদের বিলাসবহুল সম্পত্তি থেকে প্রায়শই এমন বিদেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। দেশটির মাদক কার্টেলগুলো নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতীক হিসেবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করতে এই হিংস্র প্রাণীগুলোকে লালন-পালন করে থাকে। ২০২৩ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সিনালোয়া কার্টেলের একটি দল তাদের শত্রুদের জীবিত বা মৃত অবস্থায় বাঘের খাঁচায় ছুড়ে দিত। তবে এবার জ্বালানি চোরাচালান বিরোধী অভিযানের সময় আকস্মিকভাবে এই প্রাণীগুলোর সন্ধান পায় সেনাবাহিনী।
মেক্সিকোর অপরাধী চক্র ও মাদক কার্টেলগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে শুল্কমুক্ত পেট্রোল ও ডিজেল চোরাচালান এবং তা পুনরায় বিক্রি করা অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। মেক্সিকান কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে এই জ্বালানি চোরাচালানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে, যাতে নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে। সেই সময় তামাউলিপাস থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন লিটার অবৈধ জ্বালানি জব্দ করা হয়েছিল।
এই চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ফার্নান্দো ফারিয়াস নামের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি চোরাচালানের অভিযোগ গঠন করেছে। ফার্নান্দোকে গত সপ্তাহে আর্জেন্টিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এছাড়া, জ্বালানি চুরির অভিযোগে তামাউলিপাসের সাবেক গভর্নর আর্নেস্তো রুফোকেও সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মাদক পাচারের পর জ্বালানি চুরি—যা মেক্সিকোতে স্থানীয়ভাবে 'হুয়াচিকল' (huachicol) নামে পরিচিত—কার্টেলগুলোর আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কার্টেল সদস্যরা মেক্সিকোর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি 'পেমেক্স' (Pemex)-এর অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে, পাইপলাইন ফুটো করে, শোধনাগার থেকে তেল সরিয়ে, ট্যাংকার ট্রাক হাইজ্যাক করে এবং কর্মীদের ভয় দেখিয়ে জ্বালানি ও অপরিশোধিত তেল চুরি করে।
এই চুরি করা জ্বালানি মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্য আমেরিকা জুড়ে বিক্রি করা হয়। অন্যদিকে, কর ফাঁকি ও পরিবেশগত নজরদারি এড়াতে অপরিশোধিত তেলকে প্রায়শই 'বর্জ্য তেল' (waste oil) হিসেবে সাজিয়ে সহযোগী দালালদের মাধ্যমে উত্তরে পাচার করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর এই তেল দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের কিছু অসাধু আমদানিকারকের কাছে পাঠানো হয় এবং মার্কিন ও বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপক ছাড়ে বিক্রি করা হয়। এর থেকে অর্জিত অর্থ গোপনে আবার কার্টেলগুলোর কাছে ফেরত যায়। এমনকি মার্কিন কর্তৃপক্ষ জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের বিরুদ্ধে নিজস্ব সার্ভিস স্টেশন পরিচালনা করারও অভিযোগ এনেছে।
এই অবৈধ চক্রের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত জুনে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ কার্টেল-সংশ্লিষ্ট জ্বালানি চুরি চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মেক্সিকোর দুই নাগরিক এবং পরিবহন, আর্থিক পরিষেবা ও আবাসন খাতের নয়টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর ডিসেম্বরে একটি সহিংস মেক্সিকান জ্বালানি চোর কার্টেল এবং তাদের কারাগারে বন্দি নেতা—যার ডাকনাম 'দ্য স্লেজহ্যামার'—এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।




























