মানবজীবনে যেকোনো কাজের প্রকৃত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ফলাফলের চেয়ে অন্তরের চালিকা শক্তি বা ‘নিয়ত’ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি জীবনদর্শনে নিয়ত হলো এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা একজন মুমিনের সাধারণ অভ্যাস বা জাগতিক কাজকেও অত্যন্ত সওয়াবের ইবাদতে রূপান্তর করতে পারে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নিয়তের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা মুমিনের অন্যতম প্রধান আত্মিক দায়িত্ব।
কাজের ভিত্তিই হলো নিয়ত। যদি নিয়ত সঠিক না থাকে, তবে বড় কোনো সাফল্যও আল্লাহর দরবারে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে রাসুল, আপনি মানুষদের বলে দিন, তোমাদের অন্তরে যা কিছু আছে, তোমরা তা গোপন করো বা প্রকাশ করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত আছেন…’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ২৯)। রাসুল (সা.) এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘কাজের প্রতিদান তো নিয়তের ওপরই নির্ভরশীল’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)।
একজন মুমিন যখন তার দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহ, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা শারীরিক সুস্থতার জন্য আহার গ্রহণ বা বিশ্রামের মতো প্রাত্যহিক কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করেন, তখন সেগুলো আর জাগতিক অভ্যাস থাকে না, বরং ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে সুরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’
তবে নিয়ত বিশুদ্ধ না থাকলে তা ‘রিয়া’ বা লোক দেখানোর মানসিকতায় পরিণত হতে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব বড়ই দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য যারা তাদের নামাজে উদাসীন। যার লোক দেখানোর জন্য তা করে’ (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)। রাসুল (সা.) একে ‘ছোট শিরক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সতর্ক করেছেন। কিয়ামতের দিন রিয়াকারীদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলবেন, ‘তোমরা ওই লোকেদের কাছে যাও, যাদের দেখিয়ে দুনিয়াতে আমল করতে। আর চেষ্টা করো তাদের কাছ থেকে কোনো বিনিময় বা কল্যাণ পাও কি না?’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৬৮৩১)।
নিয়ত যেহেতু অন্তরের বিষয় এবং এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তাই একে বিশুদ্ধ রাখার জন্য কিছু চর্চা প্রয়োজন। কাজের শুরুতে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য? যদি উদ্দেশ্য মানুষ হয়, তবে তা শুধরে নিতে হবে। এছাড়া নফল ইবাদত বা দান-সদকা গোপনে করার অভ্যাস করা এবং নিয়মিত ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে অন্তরের কলুষতা দূর করার চেষ্টা করা বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ। মাহমুদ হাসান ফাহিম, শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর, এভাবেই নিয়তের গুরুত্ব ও সংশোধনের উপায় তুলে ধরেছেন।
যার লোক দেখানোর জন্য তা করে।’ (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)রাসুল (সা.) এ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ওপর যে বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করি ছোট শিরক সম্পর্কে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ছোট শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘“রিয়া” বা লোক দেখানো আমল।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)আরেক বর্ণনায় এসেছে, আমলের প্রতিদান দিবসে আল্লাহ–তাআলা রিয়াকারীদের বলবেন, ‘তোমরা ওই লোকেদের কাছে যাও, যাদের দেখিয়ে দুনিয়াতে আমল করতে।






























